উম্মে ওয়ারার কলাম

অন্তর্বর্তী সরকার: দায়মুক্তি অধ্যাদেশগুলোর বিহিত জরুরি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটে বিজয়ী হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বিএনপি। ১৭ ফেব্রুয়ারি  দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তবে বিএনপির নির্বাচিতরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।
অন্যদিকে জামায়াত-এনসিপির নির্বাচিত সদস্যরা একই সঙ্গে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন।

সরকারি ও বিরোধী দলের দুই ধরনের শপথ গ্রহণের কারণে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে। কেননা রাষ্ট্রপতির জারি করা জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করার কথা। এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমে বলেন,  ‘সংবিধানে এ বিষয় নিয়ে সংশোধনের আগে দ্বিতীয় শপথ নেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।’

আইনি বিচারে তাঁর কথার যৌক্তিকতা রয়েছে; কেননা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারি করা এ আদেশের কোনো আইনি বৈধতাই নেই। কেননা বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৩(১) অনুযায়ী, কেবল জরুরি পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারবেন। অনুচ্ছেদটি কিছু শর্তও জুড়ে দিয়েছে এসব অধ্যাদেশের বৈধতা প্রসঙ্গে। যেখানে বলা আছে, সংসদ যে আইন তৈরি করার ক্ষমতা রাখে না, অধ্যাদেশ দিয়ে সেই ধরনের কোনো আইন করা যাবে না।

এমনকি অধ্যাদেশ দিয়ে সংবিধানের কোনো অংশ পরিবর্তন বা বাতিল করাও সম্ভব নয়। কাজেই উক্ত অনুচ্ছেদে আদেশ জারির কোনো ক্ষমতা রাষ্ট্রপতিকে দেওয়া হয়নি এবং অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা রাখলেও তা কোনোভাবেই সংবিধান পরিবর্তন করার এখতিয়ার রাখে না। সংবিধানের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরিবর্তনও কেবল সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের অনুমোদনের ফলেই সম্ভব।

কাজেই দেখা যাচ্ছে যে যথাযথভাবে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ তথা এই আদেশের ভিত্তিতে হওয়া গণভোট নিশ্চিতভাবেই আইনি জটিলতায় পড়তে যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত গণভোটের ফলাফল বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে।

প্রশ্ন হলো, যাঁরা এই পুরো সংস্কারপ্রক্রিয়া ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারির প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন, তাঁরা কি সংবিধানের এই মৌলিক ধারাগুলো সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না?

জানা গেছে, ভবিষ্যতে কোনো অন্তর্বর্তী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেন গণভোট আয়োজন করতে না পারে, হাইকোর্টের কাছে এমন ঘোষণার জন্যও আবেদন করা হয়েছে। এমনকি ১৮ ফেব্রুয়ারি ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’-এর কার্যক্রম স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী। স্পষ্টত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা সব অধ্যাদেশ ও অন্য নীতিমালা আইনের মারপ্যাঁচের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।

প্রশ্ন হলো, যাঁরা এই পুরো সংস্কারপ্রক্রিয়া ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারির প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন, তাঁরা কি সংবিধানের এই মৌলিক ধারাগুলো সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না?

জুলাই অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত সবাই বিশ্বাস করেছিলেন যে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশগুলো নানাভাবে তাঁদের দায়মুক্তি নিশ্চিত করবে পরবর্তী সরকারের আমলেও। যেমন ধরুন, গত ২৫ জানুয়ারি ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ শিরোনামে ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি দিয়ে অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। মূলত জুলাই-আগস্ট মাসে আন্দোলনকারীদের দ্বারা সংঘটিত সব ফৌজদারি অপরাধ থেকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয় দায়মুক্তির অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে।

এ ছাড়া গণভোট অধ্যাদেশ ২০২৫-এ ‘দায়মুক্তি’ শিরোনামের ধারা ২২-এ বলা হয়, এই অধ্যাদেশের অধীনে কোনো আদেশ বা নির্দেশ পালন করা কোনো কাজের জন্য কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা বা অন্য কোনো আইনগত কার্যধারা দায়ের করা যাবে না। দায়মুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অধ্যাদেশ ২০২৪’ শিরোনামে একটি অধ্যাদেশ চূড়ান্ত হওয়ার কথা জানা গেলেও শেষ পর্যন্ত জারি হয়নি। এই অধ্যাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রয়োগ করা অধ্যাদেশ, বিধি ও প্রজ্ঞাপনের বৈধতা সম্পর্কে কোনো আদালত বা কর্তৃপক্ষ পরে কোনোভাবেই প্রশ্ন উত্থাপন বা একে অবৈধ বা বাতিল করতে পারবে না মর্মে ধারা যোগ করা হয়েছিল।

এ ধরনের দায়মুক্তি সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। কেননা সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৬ অনুযায়ী, শুধু জাতীয় সংসদের এখতিয়ার আছে কোনো আইনের মাধ্যমে দায়মুক্তি-বিধানের ক্ষমতা প্রয়োগ করার। এমনকি বর্তমান সংসদ অধিবেশনের প্রথম বৈঠকেই অধ্যাদেশগুলো উপস্থাপন করতে হবে। সংসদ চাইলে তা পাস করতে পারে বা বাতিল করতে পারে। সংসদ বসার ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন না পেলে অধ্যাদেশগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। [অনুচ্ছেদ ৯৩(১)]

প্রশ্ন হলো, নানা অধ্যাদেশের মাধ্যমে এতবার দায়মুক্তির প্রয়োজন কেন বোধ করল অন্তর্বর্তী সরকার? তারা কি জানত যে তারা এমন কিছু কাজ করেছে, যা সংবিধানবিরোধী হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং এ জন্য পরে তাদের আইনের মুখোমুখি দাঁড়াতে হতে পারে? আর এভাবে দায়মুক্তির অধ্যাদেশ দিয়ে আসলেই কি অন্তর্বর্তী সরকার তার সব আইনি ও নৈতিক দায় এড়াতে পারে? কেননা যেকোনো নির্বাচিত সরকারের শাসনামল শেষ হওয়ার পর ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে তাদের আমলের নানা কার্যক্রমের দায় বা ফলাফল রাজনৈতিক দলকেই ভোগ করতে হয়, কখনো আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, কখনো গণ-অভ্যুত্থান বা নানা সামাজিক প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে।

২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের শাসনামল শেষ হওয়ার পর ক্ষমতায় থাকার সময় নিজেদের নানা ভুলভ্রান্তির জন্য যেমন তাদের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে, ঠিক তেমনি ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারকেও নানাভাবে চোকাতে হচ্ছে তাদের আমলের নানা অপকর্ম ও অপরাধের দায়। সংবিধান ছুঁয়ে শপথ নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার কীভাবে তাদের শাসনামলের দায় এড়িয়ে যাবে?

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বহু আওয়ামীপন্থী রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সংবাদকর্মী বা বাউল সাধকসহ অন্য ব্যক্তিদের মাসের পর মাস বিনা বিচারে আটক করে রাখা হয়েছে, যা সংবিধানের আইনের আশ্রয়লাভের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুই শতাধিক মাজার ভাঙা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের ওপর আক্রমণ বা প্রথম আলো-ডেইলি স্টার–এর মতো সর্বাধিক পঠিত সংবাদমাধ্যমের ওপর মব সন্ত্রাসের জন্য কেন তাদের জবাবদিহি চাওয়া হবে না? এ ছাড়া বিশ্বশান্তি সূচক ও দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশের অবনতি কি অন্তর্বর্তী সরকারের দায় নয়? নানা সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতির যে অভিযোগের কথা সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে, সেগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত কি জনগণ আশা করতে পারে না?

আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, সরকার গঠনের দিন প্রধান উপদেষ্টাসহ প্রত্যেক উপদেষ্টা শপথ গ্রহণকালে পাঠ করেছেন, ‘আমি ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হইয়া সকলের প্রতি আইন–অনুযায়ী যথাবিহীত আচরণ করিব।’ (বাংলাদেশ সংবিধান, তৃতীয় তফসিল)। অথচ নানা সময়ে আমরা দেখেছি, উপদেষ্টাদের কারও কারও কর্মকাণ্ডে তাঁদের অনুরাগ ও বিরাগ প্রকাশ পেয়েছে।

নতুন সরকার যেহেতু প্রথম থেকেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে, তাই যৌক্তিক হবে শুরুতেই অন্তর্বর্তী সরকার আমলের দায়মুক্তির অধ্যাদেশগুলোর আইনি বিহিত করা এবং ওই আমলে ঘটে যাওয়া সব অপরাধ ও অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত করা। অন্যথায় অনির্বাচিত সরকারের নানা কৃতকর্মের দায় নতুন সরকারকেও বয়ে বেড়াতে হবে। 

  • উম্মে ওয়ারা সহযোগী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

    *মতামত লেখকের নিজস্ব