৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন বেতন স্কেল অনুমোদিত হয়েছে। সর্বনিম্ন বেতন যা ছিল ৮ হাজার ২৫০ টাকা, নতুন স্কেলে তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা, বৃদ্ধির হার শতকরা ১৪২ ভাগ। ১ থেকে ১১ গ্রেড পর্যন্ত বেতন দ্বিগুণ করা হয়েছে। একজন সচিবের বেতন ৭৮ হাজার থেকে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। স্কেল কার্যকর হবে গত ১ জুলাই ২০২৬ থেকে।
বেতন কমিশন গঠিত হয়েছিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। মূলত তাদের সুপারিশের ভিত্তিতেই নতুন বেতন স্কেল অনুমোদিত হয়েছে। দেশের আর্থিক অবস্থা খুব ভালো নয়, এটা সবাই জানেন। তারপরও নতুন বেতন স্কেল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
কারণ, বিগত ১২ বছর একই পুরোনো স্কেলে সরকারি কর্মীরা বেতন পাচ্ছিলেন, আর এই সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় ন্যূনতম দ্বিগুণ হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সে হিসাবে বেতন দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি ‘লিভিং ওয়েজ’ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ছিল।
পরবর্তী পর্যায়ে অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন বৃদ্ধির ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত হয়েছে। নিম্নতম স্কেলে যাঁরা অবসরে আছেন, তাঁদের পেনশন বাড়বে শতকরা ১০০ ভাগ। যাঁদের বর্তমান পেনশনের পরিমাণ বেশি, তাঁদের ক্ষেত্রে এই হার ক্রমান্বয়ে কমতে কমতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়ে তা দাঁড়াবে শতকরা ৫৫ ভাগ।
অর্থাৎ সচিবের বেতন যেখানে ১০০ ভাগ বেড়েছে, একজন অবসরপ্রাপ্ত সচিবের পেনশন বাড়বে ৫৫ ভাগ। অতীতেও এমনটাই হয়েছে, পেনশন বৃদ্ধি সব সময়ই বেতন বৃদ্ধির চেয়ে কম হয়েছে, আর দুইয়ের মাঝে তফাত বৃদ্ধিও অব্যাহত থেকেছে। আমার আশপাশে তো অবসরপ্রাপ্তদেরই ছড়াছড়ি, বেশির ভাগ দেখলাম বিষয়টা নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন।
যিনি সদ্য অবসরে গেছেন এবং তিনি যে দামে বাজার থেকে তাঁর প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনবেন, যিনি দীর্ঘদিন আগে অবসরে গেছেন, তাঁকেও বাজারে গিয়ে দৈনন্দিন জিনিসপত্র একই দামে কিনতে হবে
২০১৪ সালের জানুয়ারির শেষে আমি অবসরে যাই, এরপর নিয়ম অনুযায়ী পিআরএল শেষ হওয়ার পর থেকে পেনশন পেয়ে আসছি ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে। এর পাঁচ মাস পর নতুন বেতন স্কেল চালু হলো এবং তার পরদিন থেকে আমার একই র্যাঙ্কে যাঁরা অবসরে গেলেন, তাঁদের পেনশন হলো আমার চেয়ে প্রায় ১০ হাজার টাকা বেশি। আরও একটি মজার বিষয় এখানে উল্লেখ করতে পারি।
আবুল মাল আবদুল মুহিত সাহেব, যিনি অর্থমন্ত্রী ছিলেন, তিনি তো রিটায়ার করেছেন বহুদিন আগে। আমি যখন ৩০ হাজার টাকার বেশি পেনশন পাই, তাঁর পেনশন তখন ১০ হাজার টাকার মতো।
সারা জীবন যিনি সরকারের হয়ে কাজ করেছেন, তিনি যেন অবসরের পর খেয়ে-পরে থাকতে পারেন, এ জন্যই পেনশন। যাঁরা দীর্ঘ জীবন লাভ করেছেন, এ কথা স্পষ্টতই তাঁদের ক্ষেত্রে আর খাটে না।
এই যে একটি অদ্ভুত ব্যবস্থা, এ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় ছিল এক র্যাঙ্কে এক পেনশন ব্যবস্থা চালু করা। বেতন কমিশন যখন গঠিত হয়, সেখানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন। আমি তাঁকে বলেছিলাম এক র্যাঙ্ক এক পেনশন ব্যবস্থাটি যেন কমিশন থেকে সুপারিশ করা হয়। যা-ই হোক, বিজ্ঞ কমিশন তা করেননি।
বর্তমান অবস্থায় সেটি করতে গেলে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি হবে, এই যুক্তিতে সরকারও এটি করেনি। এ যুক্তি হয়তো সঠিক, কিন্তু যা অবশ্যই করা যেত তা হচ্ছে বেতন বৃদ্ধির হারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পেনশন বাড়ানো, আর তা করলে একধরনের সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হতো।
যিনি সদ্য অবসরে গেছেন এবং তিনি যে দামে বাজার থেকে তাঁর প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনবেন, যিনি দীর্ঘদিন আগে অবসরে গেছেন, তাঁকেও বাজারে গিয়ে দৈনন্দিন জিনিসপত্র একই দামে কিনতে হবে। পেনশন এবং সঞ্চয়পত্রের বাইরে যাঁদের আরও অনেক আয়ের উৎস আছে, তাঁদের কথা আলাদা।
তবে পেনশনপ্রাপ্তদের বড় অংশের কিন্তু আর তেমন কোনো উৎস নেই। তাঁদের জন্য সময়টা কঠিন হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। আমার জানার মধ্যেই সচিব হিসেবে রিটায়ার করেছেন, এমন কেউ কেউ আর্থিক দৈন্যদশার মধ্যে আছেন।
এ তো গেল সর্বোচ্চ পর্যায়ে থেকে যাঁরা অবসরে গেছেন, তাঁদের কথা। নিম্ন বেতনভুক যে কর্মচারীরা আছেন, তাঁদের বেতন বাড়ানো হয়েছে ১৪০ শতাংশ। আবার তাঁদের সহকর্মী যাঁরা অবসরে গেছেন, তাঁদের পেনশন বাড়ানো হয়েছে ১০০ শতাংশ।
এই অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের এমনিতেই পেনশনের পরিমাণ যথেষ্ট কম এবং দ্রব্যমূল্যের চাপে তাঁরা অনেকেই দুর্দশায় আছেন। তাঁদের পেনশন যদি তাঁদের সহকর্মীদের বেতন বৃদ্ধির সমহারে করা হতো, তাহলে তাঁরা একধরনের একটা সম্মানজনক জীবন কাটাতে পারতেন।
পেনশনভোগীদের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বৈষম্যমূলক মনোভাব একটা খারাপ বার্তাও দেয় বলে আমি মনে করি। এটা যেন অনেকটা এ রকম বলে দেওয়া, ঠিক আছে যখন সুযোগ আছে, তখন ভবিষ্যতের জন্য ব্যবস্থা করে নাও। এরপর কিন্তু সরকার আর তেমন কোনো দায়িত্ব নেবে না।
মো. তৌহিদ হোসেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা
মতামত লেখকের নিজস্ব