প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর বাংলাদেশের আসিয়ানভুক্তির বিষয়টি নতুন করে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা তৈরি করে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর বাংলাদেশের আসিয়ানভুক্তির বিষয়টি নতুন করে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা তৈরি করে

মতামত

বাংলাদেশ কি সত্যিই আসিয়ানের সদস্য হতে পারবে?

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে আসিয়ান এখন আর দূরের কোনো আঞ্চলিক সংগঠন নয় বরং এটি ধীরে ধীরে এক কৌশলগত আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হচ্ছে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের আসিয়ান-অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নটি নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনায় তুলেছিলেন।

এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন, এবং ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে একই অনুরোধ আবারও গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপিত হবে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি সত্যিই আসিয়ানের সদস্য হতে পারে? নাকি এটি আপাতত একটি রাজনৈতিক বার্তা, যার বাস্তব রূপ নিতে দীর্ঘ সময়, ধারাবাহিক প্রস্তুতি এবং আঞ্চলিক আস্থার প্রয়োজন?

এই প্রশ্নের উত্তর সরল নয়। কারণ আসিয়ান শুধু একটি বাণিজ্যিক জোট নয় এটি একটি ভৌগোলিক, রাজনৈতিক, নিরাপত্তাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্প্রদায়। বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, জনসংখ্যাগতভাবে শক্তিশালী, ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত এবং বঙ্গোপসাগরীয় ভূরাজনীতিতে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

কিন্তু আসিয়ান সদস্যপদ শুধু সম্ভাবনার ওপর নির্ভর করে না এটি নির্ভর করে সনদের ভাষা, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর ঐকমত্য, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, ভৌগোলিক পরিচয়, রাজনৈতিক আস্থা এবং আঞ্চলিক ভারসাম্যের ওপর।

আসিয়ান সনদের অনুচ্ছেদ ৬ অনুযায়ী নতুন সদস্য হওয়ার চারটি মৌলিক শর্ত আছে। প্রথমত, রাষ্ট্রটির অবস্থান স্বীকৃত দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ভৌগোলিক অঞ্চলে হতে হবে। দ্বিতীয়ত, তাকে সব আসিয়ান সদস্যরাষ্ট্র স্বীকৃতি দিতে হবে। তৃতীয়ত, তাকে আসিয়ান সনদ মানতে হবে। চতুর্থত, তাকে সদস্যপদের দায়-দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা ও সদিচ্ছা দেখাতে হবে। এর বাইরে একটি বাস্তব রাজনৈতিক শর্ত আছে, আসিয়ানে সিদ্ধান্ত হয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে। অর্থাৎ একটি সদস্যরাষ্ট্রও আপত্তি করলে পূর্ণ সদস্যপদ আটকে যায়।

বাংলাদেশ কি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অংশ?

এই জায়গাতেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি দাঁড়ায়: বাংলাদেশ কি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অংশ? ভূগোল বলবে, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্র। কিন্তু কৌশলগত ভূগোল বলবে, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগবিন্দু।

বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত ভাগ করে, বঙ্গোপসাগরের মাধ্যমে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে সামুদ্রিক সংযোগের সম্ভাবনা রাখে, এবং ঐতিহাসিকভাবে আরাকান, চট্টগ্রাম, বঙ্গোপসাগর ও মালয় জগতের মধ্যে বাণিজ্য, শ্রম, ধর্ম ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান ছিল। তাই বাংলাদেশের যুক্তি হতে পারে: আমরা মানচিত্রের প্রান্তে নই বরং দুই অঞ্চলের সেতুতে দাঁড়িয়ে আছি।

কিন্তু আসিয়ান শুধু কৌশলগত কল্পনার ভিত্তিতে সদস্য নেয় না। তিমুর-লেস্তের উদাহরণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তিমুর-লেস্তে নিঃসন্দেহে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভৌগোলিক অঞ্চলের ভেতরে ছিল। তবু ২০১১ সালে আবেদন করার পরও তাকে পূর্ণ সদস্য হতে অপেক্ষা করতে হয়েছে এক দশকের বেশি সময়। তাকে প্রথমে পর্যবেক্ষক মর্যাদা দেওয়া হয়, এরপর পূর্ণ সদস্যপদের জন্য একটি রোডম্যাপ দেওয়া হয়।

সেই রোডম্যাপে ছিল আইনি দলিল গ্রহণ, আসিয়ানের তিনটি স্তম্ভ-রাজনৈতিক-নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক, সমাজ-সাংস্কৃতিক-সম্পর্কিত বৈঠকে অংশগ্রহণ, প্রশাসনিক সক্ষমতা তৈরি, এবং সদস্যপদের দায় বহনের প্রস্তুতি।

তিমুর-লেস্তের অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের সম্ভাবনা

২০২৫ সালে তিমুর-লেস্তে ১১ তম সদস্য হলো। অর্থাৎ ভূগোল যথেষ্ট নয়; ভূগোলের সঙ্গে ধৈর্য, প্রতিষ্ঠান, প্রস্তুতি ও ঐকমত্য লাগে। বাংলাদেশের সম্ভাবনা কোথায়? প্রথমত, বাংলাদেশ একটি বড় বাজার।

প্রায় ১৮ কোটি মানুষের অর্থনীতি, তরুণ শ্রমশক্তি, তৈরি পোশাক শিল্প, ওষুধ, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত পণ্য, জাহাজ নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবা খাতে বাংলাদেশের সক্ষমতা আসিয়ানের জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে। আসিয়ানের অনেক দেশ দ্রুত বার্ধক্যের দিকে যাচ্ছে। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশে শ্রমবাজারে বিদেশি শ্রমিকের প্রয়োজন আছে। বাংলাদেশের শ্রমশক্তি, যদি দক্ষতা, ভাষা, অধিকার ও ন্যায্য নিয়োগব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তাহলে আসিয়ান অর্থনীতির সঙ্গে বাস্তব সংযোগ তৈরি করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র। আজকের ইন্দো-প্যাসিফিক রাজনীতিতে বঙ্গোপসাগর শুধু সমুদ্র নয়; এটি বাণিজ্যপথ, জ্বালানি নিরাপত্তা, নৌ-সংযোগ, উপকূলীয় অর্থনীতি, জলবায়ু ঝুঁকি এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। আসিয়ান যদি নিজেকে শুধু মেকং বা দক্ষিণ চীন সাগরকেন্দ্রিক না রেখে বৃহত্তর সামুদ্রিক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হিসেবে ভাবতে চায়, তাহলে বাংলাদেশকে উপেক্ষা করা কঠিন। চট্টগ্রাম, মাতারবাড়ী, পায়রা, মংলা-এসব বন্দর শুধু বাংলাদেশের সম্পদ নয়, এগুলো হতে পারে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্য করিডর।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশ আসিয়ানকে দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার একটি সেতু হতে পারে। সার্ক প্রায় অকার্যকর, বিমসটেক এখনো পূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি পায়নি, আর ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা আঞ্চলিক সহযোগিতাকে জটিল করে রেখেছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশ যদি আসিয়ানের সঙ্গে গভীর অংশীদারিত্ব গড়ে তোলে, তাহলে তা শুধু বাংলাদেশের লাভ নয়, আসিয়ানেরও লাভ। কারণ আসিয়ান তখন দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য, সংযোগ, শ্রমবাজার, জলবায়ু সহযোগিতা ও নিরাপত্তা আলোচনায় একটি নতুন প্রবেশদ্বার পাবে।

বাংলাদেশ হয়তো আজই আসিয়ানের সদস্য হতে পারবে না। কিন্তু বাংলাদেশ যদি নিজেকে দক্ষিণ এশিয়ার বন্দি রাষ্ট্র হিসেবে না দেখে বঙ্গোপসাগরীয় ও ইন্দো-প্যাসিফিক সংযোগরাষ্ট্র হিসেবে নির্মাণ করতে পারে, তাহলে আসিয়ানের সঙ্গে তার সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাবে। পূর্ণ সদস্যপদ হয়তো দীর্ঘ পথ কিন্তু পথের শুরু আজই হতে পারে। তিমুর-লেস্তে দেখিয়েছে, আসিয়ানের দরজা বন্ধ নয় তবে দরজায় পৌঁছাতে ধৈর্য, প্রস্তুতি ও ঐকমত্য লাগে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কঠিন প্রশ্নও আছে। প্রথম প্রশ্ন ভৌগোলিক। আসিয়ান দেশগুলো বলতে পারে, বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্বীকৃত ভৌগোলিক অঞ্চলে পড়ে না। তিমুর-লেস্তের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা তাই সীমিত। তিমুর-লেস্তে ছোট, কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশীয়; বাংলাদেশ বড়, কিন্তু দক্ষিণ এশীয়। এই ভৌগোলিক আপত্তিই সবচেয়ে বড় আইনি ও রাজনৈতিক বাধা হতে পারে।

দ্বিতীয় প্রশ্ন-আসিয়ানের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা। তিমুর-লেস্তেকে অন্তর্ভুক্ত করতেই আসিয়ানকে দীর্ঘ সময় নিতে হয়েছে। এখন আবার একটি বড় জনসংখ্যার, জটিল অর্থনীতির, রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল দক্ষিণ এশীয় রাষ্ট্রকে সদস্য হিসেবে নেওয়া আসিয়ানের ভেতরে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। আসিয়ান সিদ্ধান্ত নেয় ধীরে, ঐকমত্যে, সংঘাত এড়িয়ে। বাংলাদেশ ঢুকলে আসিয়ানের ভেতরে দক্ষিণ এশিয়ার উত্তেজনা, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, মিয়ানমার সংকট, রোহিঙ্গা ইস্যু, চীন-ভারত প্রতিযোগিতা এসব কি প্রবেশ করবে? এই প্রশ্ন কিছু সদস্য নিশ্চয়ই তুলবে।

তৃতীয় প্রশ্ন-মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা সংকট। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সম্পর্ক রোহিঙ্গা প্রশ্নে গভীরভাবে জটিল। আসিয়ান নিজেই মিয়ানমার সংকটে বিভক্ত ও বিব্রত। বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করলে আসিয়ান কি রোহিঙ্গা সমস্যার আরও সরাসরি পক্ষ হয়ে যাবে? নাকি বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করলে সংকট সমাধানে নতুন কূটনৈতিক পথ খুলবে? এই দুই যুক্তির মধ্যে আসিয়ান সদস্যদের অবস্থান এক হবে না।

চতুর্থ প্রশ্ন—প্রাতিষ্ঠানিক সামঞ্জস্য। আসিয়ান সদস্যপদ মানে শত শত বৈঠক, আইনি দলিল, অর্থনৈতিক মানদণ্ড, কাস্টমস সহযোগিতা, বাণিজ্য সহজীকরণ, বিনিয়োগ নীতি, ডিজিটাল সংযোগ, শ্রমনীতি, মানব পাচারবিরোধী ব্যবস্থা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ—সব ক্ষেত্রে ধারাবাহিক অংশগ্রহণ। বাংলাদেশ কি সেই প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিয়েছে? শুধু রাজনৈতিক ঘোষণায় সদস্যপদ আসে না; আসে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক প্রস্তুতি, বিশেষজ্ঞ দল, আইনি মানচিত্র, নীতি-সমন্বয় এবং দীর্ঘ কূটনৈতিক ধৈর্যের মাধ্যমে।

বাংলাদেশকে কীভাবে এগোতে হবে

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো ধাপে ধাপে এগোনো। প্রথম ধাপ হতে পারে সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার মর্যাদা। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে এই পথে আগ্রহ দেখিয়েছে। এই মর্যাদা পেলে বাংলাদেশ বাণিজ্য, শ্রম, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও ডিজিটাল অর্থনীতির নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আসিয়ানের সঙ্গে কাজ করতে পারবে। দ্বিতীয় ধাপ হতে পারে ডায়ালগ পার্টনার বা উন্নত অংশীদারত্ব। তৃতীয় ধাপ হতে পারে বিশেষ পর্যবেক্ষক মর্যাদা বা একটি স্বতন্ত্র ‘বাংলাদেশ-আসিয়ান কানেক্টিভিটি রোডম্যাপ’। পূর্ণ সদস্যপদ যদি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হয়, তবে সেটিকে আজকের দাবির বদলে ১০ বছরের কৌশল হিসেবে ভাবতে হবে।

বাংলাদেশ তখন তিনটি কাজ করতে পারে। প্রথমত, ভৌগোলিক বিতর্ককে রাজনৈতিকভাবে আক্রমণাত্মক না করে ‘সংযোগভিত্তিক যুক্তি’ তৈরি করতে হবে—বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অংশ কি না, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে কতটা কার্যকরভাবে যুক্ত। দ্বিতীয়ত, আসিয়ান সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গভীর করতে হবে, বিশেষ করে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, ব্রুনেই ও ফিলিপাইনের সঙ্গে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশকে শ্রম রপ্তানিকারক দেশ থেকে দক্ষতা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও সামুদ্রিক সহযোগিতার অংশীদারে রূপান্তরিত হতে হবে।

তাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো ধাপে ধাপে এগোনো। প্রথম ধাপ হতে পারে সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার মর্যাদা। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে এই পথে আগ্রহ দেখিয়েছে। এই মর্যাদা পেলে বাংলাদেশ বাণিজ্য, শ্রম, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও ডিজিটাল অর্থনীতির নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আসিয়ানের সঙ্গে কাজ করতে পারবে।

দ্বিতীয় ধাপ হতে পারে ডায়ালগ পার্টনার বা উন্নত অংশীদারিত্ব। তৃতীয় ধাপ হতে পারে বিশেষ পর্যবেক্ষক মর্যাদা বা একটি স্বতন্ত্র ‘বাংলাদেশ-আসিয়ান কানেক্টিভিটি রোডম্যাপ’। পূর্ণ সদস্যপদ যদি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হয়, তবে সেটিকে আজকের দাবির বদলে দশ বছরের কৌশল হিসেবে ভাবতে হবে।

যদি বাংলাদেশ সরাসরি ‘না’ পায়, সেটি কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখা উচিত হবে না। বরং সেটিকে প্রস্তুতির সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। বাংলাদেশ তখন তিনটি কাজ করতে পারে। প্রথমত, ভৌগোলিক বিতর্ককে রাজনৈতিকভাবে আক্রমণাত্মক না করে ‘সংযোগ-ভিত্তিক যুক্তি’ তৈরি করতে হবে-বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অংশ কি না, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে কতটা কার্যকরভাবে যুক্ত।

দ্বিতীয়ত, আসিয়ান সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গভীর করতে হবে-বিশেষত মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, ব্রুনেই ও ফিলিপাইনের সঙ্গে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশকে শ্রম রপ্তানিকারক দেশ থেকে দক্ষতা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও সামুদ্রিক সহযোগিতার অংশীদারে রূপান্তরিত হতে হবে।

আসিয়ান বাংলাদেশকে কিছু শর্ত দিতে পারে। যেমন: প্রথমে সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে কাজ করা; আসিয়ান সনদ ও আইনি দলিলসমূহ পর্যালোচনা করা; দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও সংযোগ বাড়ানো; শ্রম অভিবাসনে ন্যায্য নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করা; মানবপাচার, সাইবার অপরাধ ও অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা নেওয়া; বন্দর, কাস্টমস ও সরবরাহ-শৃঙ্খল আধুনিক করা; মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা প্রশ্নে আসিয়ানের সঙ্গে সংঘাতের বদলে সমন্বিত কূটনীতি গড়া; এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন ও নীতির ধারাবাহিকতা দেখানো।

বাংলাদেশের কৌশল তাই আবেগ নয়, স্থাপত্য হওয়া উচিত। আসিয়ানে ঢোকার স্বপ্ন দেখাই যথেষ্ট নয়; সেই স্বপ্নের জন্য প্রশাসনিক ঘর বানাতে হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসিয়ান সেলকে শক্তিশালী করা, প্রতিটি আসিয়ান রাজধানীতে লক্ষ্যভিত্তিক কূটনীতি চালানো, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ী মহলকে যুক্ত করা, আসিয়ান ভাষা ও নীতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তৈরি করা, বন্দর-সংযোগ ও সরাসরি জাহাজ চলাচল বাড়ানো, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের শ্রমবাজারে ন্যায্য নিয়োগের মডেল তৈরি করা-এসব ছাড়া সদস্যপদের দাবি কাগজে থাকবে, বাস্তবে নয়।

শেষ কথা হলো, বাংলাদেশ হয়তো আজই আসিয়ানের সদস্য হতে পারবে না। কিন্তু বাংলাদেশ যদি নিজেকে দক্ষিণ এশিয়ার বন্দি রাষ্ট্র হিসেবে না দেখে বঙ্গোপসাগরীয় ও ইন্দো-প্যাসিফিক সংযোগরাষ্ট্র হিসেবে নির্মাণ করতে পারে, তাহলে আসিয়ানের সঙ্গে তার সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাবে। পূর্ণ সদস্যপদ হয়তো দীর্ঘ পথ কিন্তু পথের শুরু আজই হতে পারে। তিমুর-লেস্তে দেখিয়েছে, আসিয়ানের দরজা বন্ধ নয় তবে দরজায় পৌঁছাতে ধৈর্য, প্রস্তুতি ও ঐকমত্য লাগে।

বাংলাদেশের কাজ হলো দরজায় শুধু কড়া নাড়া নয়-এমনভাবে নিজের অবস্থান, সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করা, যাতে একদিন আসিয়ান নিজেই বুঝতে পারে: বাংলাদেশকে বাইরে রাখা মানে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেতুটিকে বাইরে রাখা।

  • ড. এ কে এম আহসান উল্লাহ অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক, নিরাপত্তা ও অভিবাসন। ইউনিভার্সিটি অব ব্রুনেই দারুসসালাম, ব্রুনেই

    akmahsanullah@gmail.com

    মতামত লেখকের নিজস্ব