মতামত

নারীকে কেন বারবার বলতে হয়, ‘আমিও পারি!’

একজন নারীকে এই সমাজে দুইবার জন্ম নিতে হয়—একবার মানুষ হিসেবে, আরেকবার নিজেকে মানুষ প্রমাণ করার জন্য। কারণ, জন্মসূত্রে নারী হওয়া সহজ, কিন্তু সমাজের চোখে একজন ‘যোগ্য মানুষ’ হয়ে ওঠা এখনো কঠিন। এখানে নারীর সাফল্যকে প্রায়ই তাঁর সৌন্দর্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়, তাঁর পরিশ্রমকে আড়াল করে দেওয়া হয় নানা সন্দেহে। তাই একজন প্রতিষ্ঠিত নারীর সবচেয়ে বড় যুদ্ধ অনেক সময় তাঁর কাজ নয়, বরং মানুষকে বোঝানো, তিনি এই জায়গার যোগ্য।

এই সমাজে একজন নারী যখন সাফল্যের সিঁড়িতে উঠতে শুরু করেন, সমাজ ও রাষ্ট্র তখনো তাঁর মেধার চেয়ে বেশি হিসাব করতে বসে তাঁর চেহারা, পোশাক, হাসি কিংবা ব্যক্তিগত জীবন। যেন একজন নারীর সাফল্য তাঁর পরিশ্রমের ফল নয়, বরং সৌন্দর্যের ‘সুযোগ’। এই সমাজ এখনো বিশ্বাস করতে শেখেনি যে একজন নারী নিজের যোগ্যতায়, জ্ঞানে, শ্রমে এবং সিদ্ধান্তে নেতৃত্বের জায়গায় পৌঁছাতে পারেন।

নারীর ক্ষমতায়ন শব্দটি আজকাল খুব জনপ্রিয়। আন্তর্জাতিক সম্মেলন, করপোরেট বিজ্ঞাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সমাজ এখনো নারীর ক্ষমতায়নকে অনেকাংশে ‘দেখে’ তাঁর বাহ্যিক উপস্থিতির ভেতর দিয়ে। একজন নারী সুন্দর হলে তাঁর সাফল্যকে সহজে মেনে নেওয়া হয় না; আবার সুন্দর না হলে তাঁকে ‘প্রেজেন্টেবল’ না হওয়ার অভিযোগ শুনতে হয়; অর্থাৎ নারীকে সব দিক থেকেই এক অদৃশ্য পরীক্ষার ভেতর দিয়ে যেতে হয়।

ফরাসি দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ার বলেছিলেন, ‘ওয়ান ইজ নট বর্ন, বাট রাদার বিকামস এ ওমেন’; অর্থাৎ সমাজই নারীর জন্য একটি নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি করে দেয়—কীভাবে কথা বলতে হবে, চলতে হবে, এমনকি কতটুকু উচ্চাকাঙ্ক্ষী হওয়া ‘গ্রহণযোগ্য’। আজও সেই কাঠামো পুরোপুরি ভাঙেনি; বরং আধুনিকতার আড়ালে তা আরও সূক্ষ্ম হয়েছে।

একজন পুরুষ যখন কর্মক্ষেত্রে সফল হন, তাঁকে বলা হয় ‘যোগ্য’, ‘পরিশ্রমী’, ‘ভিশনারি’। অথচ একজন নারী একই জায়গায় পৌঁছালে অনেক সময় ফিসফিসিয়ে প্রশ্ন ওঠে, ‘কার সাপোর্টে এ পর্যন্ত এসেছে?’ এই মানসিকতা শুধু অনুন্নত সমাজে নয়, উন্নত বিশ্বেও বিদ্যমান। হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউয়ের একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে নারীদের দক্ষতার চেয়ে তাঁদের ব্যক্তিত্ব বা ‘লাইকেবিলিটি’ বেশি বিচার করা হয়। একজন স্পষ্টবাদী, দৃঢ়চেতা, আত্মবিশ্বাসী পুরুষকে যেখানে নেতৃত্ব গুণসম্পন্ন বলা হয়, সেখানে এই গুণের নারীকে বলা হয় ‘আক্রমণাত্মক’।

এই বাস্তবতা নতুন কিছু নয়। মালালা ইউসুফজাই যখন মেয়েদের শিক্ষার অধিকারের কথা বলেছিলেন, তখন তাঁকে গুলি পর্যন্ত সহ্য করতে হয়েছে। মিশেল ওবামা তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, হোয়াইট হাউসে থেকেও তাঁকে তাঁর রং, শরীর, উচ্চারণ এবং ব্যক্তিত্ব নিয়ে বিদ্রূপ শুনতে হয়েছে। আর হলিউডে এমা ওয়াটসন নারী অধিকার নিয়ে কথা বলার পর তাঁকে ‘অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী’ বলা হয়েছিল।

অর্থাৎ নারী যত ওপরে ওঠেন, তাঁকে তত বেশি ব্যাখ্যা দিতে হয়। শুধু তাঁর কাজ নয়, পোশাক, সম্পর্ক, ব্যক্তিগত জীবন—এমনকি হাসির ধরনও যেন জনসমোলোচনার অংশ হয়ে যায়।

সোশ্যাল মিডিয়া এই সমস্যাকে আরও তীব্র করেছে। একজন প্রতিষ্ঠিত নারী কোনো অর্জনের খবর দিলে, কমেন্ট বক্সে তাঁর কাজের বিশ্লেষণের চেয়ে বেশি দেখা যায় তাঁর চেহারা নিয়ে আলোচনা। কেউ বলেন ‘বেশি স্মার্ট’, কেউ বলেন ‘অতিরিক্ত অ্যাটেনশন সিকার’, কেউ আবার তাঁর সাফল্যকে ‘ফেমিনিজম কার্ড’ বলে উড়িয়ে দেন। যেন একজন নারীকে প্রতিনিয়ত প্রমাণ করতে হবে, ‘আমি সত্যিই যোগ্য’।

কিন্তু সবচেয়ে কষ্টের জায়গা হলো, এই অবিশ্বাস শুধু পুরুষতান্ত্রিক সমাজ থেকেই আসে না; অনেক সময় নারীর প্রতিও নারীর সহমর্মিতা কম দেখা যায়। কারণ, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সমাজ নারীদের শিখিয়েছে, আরেক নারীর সাফল্য মানে নিজের জায়গা সংকুচিত হয়ে যাওয়া। ফলে কর্মক্ষেত্রে একজন প্রতিষ্ঠিত নারীকে শুধু কাজের চাপ নয়, মানসিক প্রতিযোগিতা, চরিত্রহনন এবং অদৃশ্য একাকিত্বও বহন করতে হয়।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট বারবার দেখিয়েছে, শিক্ষা ও দক্ষতায় এগোলেও নেতৃত্বের জায়গায় নারীরা এখনো বৈষম্যের শিকার। একই যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক নারী কম বেতন পান, কম সুযোগ পান, কিংবা মাতৃত্বকে তাঁদের ‘কমিটমেন্টের ঘাটতি’ হিসেবে দেখা হয়। অথচ একজন মা হওয়ার পরও একজন নারী অফিস, পরিবার এবং সমাজ—তিনটি ফ্রন্টেই যুদ্ধ করেন একসঙ্গে।

সমস্যা হলো, আমরা এখনো নারীকে মানুষ হিসেবে পুরোপুরি দেখতে শিখিনি। আমরা তাঁকে কখনো ‘সুন্দরী’, কখনো ‘অতিরিক্ত আধুনিক’, কখনো ‘বেশি ক্যারিয়ারিস্ট’, কখনো ‘অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ’—এমন নানা পরিচয়ে আটকে রাখি। কিন্তু খুব কম সময়ই ভাবি, নারীও একজন মানুষ; তাঁরও স্বপ্ন আছে, ক্লান্তি আছে, ব্যর্থতা আছে এবং সবচেয়ে বড় কথা—নিজেকে নিজের যোগ্যতায় প্রমাণ করার অধিকার আছে।

নারীকে বারবার বলতে হয়, ‘আমিও পারি!’ কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন তাঁকে এতবার বলতে হবে?

একজন নারী যদি নিজের শ্রমে, মেধায়, সংগ্রামে একটি জায়গায় পৌঁছান, তবে সেটিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে সমাজের এত অস্বস্তি কেন? কেন এখনো একজন প্রতিষ্ঠিত নারীকে তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপের ব্যাখ্যা দিতে হয়? কেন এখনো তাঁর অর্জনের চেয়ে তাঁর চেহারা বেশি আলোচিত হয়?

নারীর ক্ষমতায়ন মানে শুধু নারীর ছবি দিয়ে ক্যাম্পেইন করা নয়। নারীর ক্ষমতায়ন মানে এমন একটি সমাজ তৈরি করা, যেখানে একজন নারীকে তাঁর সৌন্দর্য নয়, তাঁর সক্ষমতা দিয়ে মূল্যায়ন করা হবে। যেখানে একজন নারী বড় পদে গেলে সেটিকে ‘ব্যতিক্রম’ মনে হবে না। যেখানে তাঁর সাফল্যের পেছনে ‘কারও হাত’ খোঁজার বদলে তাঁর পরিশ্রমকে সম্মান করা হবে।

কারণ, সৌন্দর্য মানুষকে মুহূর্তের জন্য আকৃষ্ট করতে পারে, কিন্তু জ্ঞান, শ্রম এবং যোগ্যতাই একজন মানুষকে ইতিহাসে বাঁচিয়ে রাখে। আর একজন নারী যখন নিজের পরিশ্রমে উঠে দাঁড়ান, তখন তিনি শুধু নিজের জন্য লড়েন না, তিনি পরবর্তী প্রজন্মের মেয়েদের জন্যও একটি দরজা খুলে দেন।

জুবাইয়া ঝুমা, জনসংযোগ পেশাজীবী

মতামত লেখকের নিজস্ব