
বিদেশি ব্র্যান্ড নিয়ে আমাদের হাজারো মাতামাতি থাকলেও মুরগির প্রশ্নে আমরা দেশিটাই বেশি পছন্দ করি। উর্দু–হিন্দি ভাষাভাষীরা অবশ্য অন্য ইঙ্গিতে বলে থাকেন ‘ঘর কা মুরগি ডাল বরাবর’। ঘরের মুরগি ডালের মতো পানসে। মজা লাগে না। এই বচনে মুরগিকে কেবলই একটা উপমা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, বাহানা অন্য কিছুর। তবে আমরা আমাদের চেয়ারগুলোয় ‘ডাল বরাবর’ জিনিস রাখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।
সম্প্রতি নিযুক্ত উপাচার্যকে (ভিসি) প্রত্যাখ্যান করে গাজীপুরের ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) জোরদার আন্দোলন চলছে। সেখানকার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা ঘরের লোক, চলতি ভাষায় ‘দেশি’ ভিসি চান। চলমান আন্দোলনের কথা শুনে আমার পরম শ্রদ্ধেয় প্রয়াত নানাজির কথা মনে পড়ল। আজ থেকে প্রায় ৬০ বছর আগের এক পারিবারিক ঘটনা। আমাদের এক মামাতো ভাইয়ের বিয়ের কথা প্রায় পাকাপাকি হওয়ার পর নানার গোষ্ঠীর নানান ডালপালা থেকে আওয়াজ তোলা হয়, ‘গোষ্ঠীতে কি মেয়ের অভাব?’
আমরা কেন বাঙালদের সঙ্গে কুটুম্বিতা করতে যাব? শরণার্থী হয়ে সহায়–সম্পত্তি হারিয়ে, প্রতিপত্তি খুইয়ে পূর্ব বাংলায় আসা নানাজি চাইছিলেন নতুন দেশের সমাজের সঙ্গে মিশে যেতে। এখানে তাঁর নতুন প্রভাববলয় গড়ে তুলতে, গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে। এসব ছাড়াও গোষ্ঠীভিত্তিক আত্মীয়তার বাইরে গিয়ে নতুন আত্মীয়তা তৈরির ক্ষেত্রে তাঁর ছিল বিজ্ঞানভিত্তিক অকাট্য যুক্তি। তুতো বা কাজিন ভাইবোনের মধ্যে বিয়ে যে সন্তানদের জন্য শুভ নয়, সেটা তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা করতে গিয়ে তিনি এটা জেনেছিলেন। বলতেন, অন্য পরিবেশ থেকে মানুষ এলে তাঁরা নতুন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা নিয়ে আসবে। নতুন জ্ঞানের সংস্পর্শে না এলে পুরোনো জ্ঞানে মরচে পড়ে, বিকশিত হয় না। বলা বাহুল্য, মামাতো ভাইয়ের বিয়ে আটকায়নি। নানাজি পারলেও নানার অন্য ভাই, এমনকি আমার দাদার গোষ্ঠীও তৎকালীন গোষ্ঠীতন্ত্রের চাপ সামলাতে পারেনি সব সময়, সব ক্ষেত্রে।
দেশের এক চরম ক্রান্তিলগ্নে ১৯৬৯ সালে তাঁকে উপাচার্যের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আবু সাঈদ চৌধুরী তখন ঢাকা হাইকোর্টের একজন অত্যন্ত সম্মানিত বিচারপতি ছিলেন। এর আগে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক অ্যাডভোকেট জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের সভাপতি হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ছাত্রদের অধিকার রক্ষায় অত্যন্ত সোচ্চার ছিলেন। একই সঙ্গে গণ–অভ্যুত্থানপরবর্তী ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেও জোরালো ভূমিকা পালন করেছিলেন।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হবেন এখানকার ছাত্র; উপাচার্য, সহ–উপাচার্য হবেন এখানকার শিক্ষক—এই কোটাতন্ত্র আমাদের রক্তে মিশে গেছে। আন্দোলনরত ছাত্র–শিক্ষকদের দাবি, ডুয়েট একটি বিশেষায়িত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় এখানকার একাডেমিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা ভিন্ন। তাই তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্য থেকেই উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া উচিত।
আন্দোলনের অংশ হিসেবে নতুন উপাচার্যকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে ব্যানার টাঙিয়ে দিয়ে ‘নতুন ভিসিকে লাল কার্ড’ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তাঁরা ঢাকা-শিমুলতলী সড়কে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। এসব নিয়ে পক্ষে–বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় অন্তত ২০ জন আহত হন। ঈদের ছুটি শেষ হলে কি হবে কে জানে।
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এটা নতুন ঘটনা নয়, বরং এটা একটা দর্শনে পরিণত হয়েছে। পাঠকের নিশ্চয়ই মনে আছে, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষককে জাহাঙ্গীরনগরে উপাচার্য করে পাঠানো হলে সেখানে দীর্ঘ ৯ মাস ধরে চলে ভিসি খেদাও আন্দোলন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. আনোয়ার হোসেনের উপাচার্যত্বকে ঘিরে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তা বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধে, ছাত্ররাজনীতিতে উজ্জ্বল অবদান, পারিবারিক পরিচয়, ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সম্পর্ক—কিছুই তাঁর কাজে আসেনি। ২০১২ সালের মে মাসে নিয়োগ পেয়ে বছর দেড়েকের তিক্ততার মধ্যে টিকে ছিলেন। মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি, প্রশাসনিক ভবন অবরোধ, ক্লাস–পরীক্ষা বর্জনে কাজ না হলে শুরু হয় অনশন।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ড. শুচিতা শরমিনকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তিনি আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। নিয়োগের কয়েক মাসের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, প্রশাসনিক ভবনে তালা, ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন ইত্যাদি দিয়ে আন্দোলনকে জনপ্রিয় করে তোলা হয়। প্রায় এক মাসের মধ্যে আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করলে সরকার তাঁকে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। কারও সাতে-পাঁচে না থাকা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক খোলাখুলি জানান, শুচিতা শরমিন কেমন মানুষ, সেটা বড় কথা নয়। আমার সহকর্মীরা দেখেছে, তাঁর হালসাকিন এখানকার নয়, বাইরের।
কেন আমরা চেনা মানুষ চাই
ছোটবেলায় আমাদের ছেলেধরার ভয় দেখানোর সময় অচেনা মানুষকে বিশ্বাস না করার একটা পাঠ দেওয়া হতো। যদিও বাস্তব জীবনে চেনা মানুষেরাই বেশি বিপজ্জনক বলে প্রমাণিত হয়েছে, তারপরও বাল্যকালের শিক্ষা বলে কথা। অচেনা মানুষে আমাদের ভয় চিরকালীন। তা ছাড়া যে দেশে ‘সিস্টেম’ কাজ করে না, কাজ করে চেনাজানা রেফারেন্স, সেখানে মানুষ শঙ্কিত হতেই পারে। যেকোনো পরিবর্তনে নতুন ভারসাম্যের বলয় তৈরি হয়, পুরোনো বলয়ে আঁচড় পড়ে আর ভিসি নিয়োগ মানে—সিন্ডিকেটে প্রভাব, ডিন নিয়োগে প্রভাব, প্রশাসনিক পদ বণ্টন, গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্পে প্রভাব।
তাই বাইরের কেউ এলে স্থানীয় ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যেতে পারে। অনেক আন্দোলনের পেছনে এই বাস্তব কারণও কাজ করে। বাংলাদেশে ভিসি নিয়োগ বহুদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়। অনেক সময় দেখা যায়, সরকার–সমর্থক শিক্ষকগোষ্ঠী একধরনের প্রার্থী চায়, আবার সরকারের বা আন্দোলনের শরিক অন্য গোষ্ঠী অন্য ধরনের প্রার্থী চায়।
বাইরের কোনো শিক্ষক নিয়োগ পেলে স্থানীয় গোষ্ঠীগুলো মনে করতে পারে যে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তাদের মতামতকে উপেক্ষা করেছে। ভিসি পদকে অনেক শিক্ষক তাঁদের পেশাগত জীবনের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখেন। যখন বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কাউকে আনা হয়, তখন স্থানীয় অনেক জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক মনে করেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্য লোক নেই—এমন বার্তা দেওয়া হচ্ছে।’ ফলে অসন্তোষ তৈরি হয়।
অবশ্য অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ‘বাইরের ভিসি বনাম ভেতরের ভিসি’ প্রশ্নটি প্রায়ই মূল সমস্যা নয়। প্রকৃত প্রশ্নগুলো হলো— নিয়োগপ্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ? শিক্ষকসমাজের অংশগ্রহণ আছে কি না? ভিসি কতটা নিরপেক্ষ? প্রশাসনিক ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে?
অর্থাৎ বিরোধের মূল কারণ প্রায়ই ব্যক্তির পরিচয়ের চেয়ে তাঁর নিয়োগের প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক অবস্থান এবং প্রশাসনিক আচরণের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত।
শিক্ষক নন এমন ব্যক্তি কি ভিসি হতে পারেন
উপাচার্য মূলত একজন প্রশাসক বা ব্যবস্থাপক। মেধাবী ছাত্র যেমন তুখোড় শিক্ষক হওয়ার গ্যারান্টি নয়, তেমনি মহাপণ্ডিত শিক্ষকমাত্রই দারুণ প্রশাসক হবেন, তেমনটি নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রিয় ও সফল উপাচার্যদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।
দেশের এক চরম ক্রান্তিলগ্নে ১৯৬৯ সালে তাঁকে উপাচার্যের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আবু সাঈদ চৌধুরী তখন ঢাকা হাইকোর্টের একজন অত্যন্ত সম্মানিত বিচারপতি ছিলেন। এর আগে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক অ্যাডভোকেট জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের সভাপতি হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ছাত্রদের অধিকার রক্ষায় অত্যন্ত সোচ্চার ছিলেন। একই সঙ্গে গণ–অভ্যুত্থানপরবর্তী ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেও জোরালো ভূমিকা পালন করেছিলেন।
গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক
wahragawher@gmail.com
মতামত লেখকের নিজস্ব