১০ মাসের সন্তান মাহাজবিকে বাঁচানো গেল না। তিন দিন আইসিইউতে চিকিৎসার পর হামে মৃত্যু হয় ছেলের। নাড়িছেঁড়া ধনের নিথর শরীরে মাথা ঠেকিয়ে কান্না যেন থামছে না মা শিউলি আক্তারের। রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের নিচতলায়
১০ মাসের সন্তান মাহাজবিকে বাঁচানো গেল না। তিন দিন আইসিইউতে চিকিৎসার পর হামে মৃত্যু হয় ছেলের। নাড়িছেঁড়া ধনের নিথর শরীরে মাথা ঠেকিয়ে কান্না যেন থামছে না মা শিউলি আক্তারের। রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের নিচতলায়

উম্মে ওয়ারার কলাম

জনস্বার্থের বিষয়গুলো জনস্মৃতি থেকে হারিয়ে যায় কেন

জবাবদিহির অভাব একটি দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি করে, যেখানে পুনরাবৃত্ত ঘটনার পরও জনমত ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যায় এবং ভুলে যাওয়াই একটি স্বাভাবিক সামাজিক প্রতিক্রিয়ায় পরিণত হয়। জনস্বার্থের বিষয়গুলো কেন জনস্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়, তা নিয়ে লিখেছেন উম্মে ওয়ারা

আমাদের সমাজে নিজেদের স্মরণশক্তির স্থায়িত্ব নিয়ে মজা করে গোল্ড ফিশ মেমোরি’র কথা বলা হয়। কথাটি দিয়ে বোঝানো হয় যে গোল্ডফিশ বা সোনালি মাছের মতো আমাদের স্মরণশক্তিও খুব স্বল্প সময়ের হয়ে থাকে। কথিত আছে, এই মাছ নাকি প্রতি তিন সেকেন্ড পর ঘটে যাওয়া ঘটনা ভুলে যায়।

গুগলে খুঁজে দেখলাম, তথ্যটি একেবারেই সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে গোল্ডফিশের স্মৃতিব্যাপ্তি কমপক্ষে তিন মাসের হয়ে থাকে, যা সর্বোচ্চ কয়েক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। কিন্তু কেন আমরা নিজেরাই নিজেদের স্মৃতিশক্তি নিয়ে এমন উপহাস করি?

এর অন্যতম কারণ হলো, অঘটনঘটনপটিয়সী এই বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকে। তাই লক্ষ করলেই দেখা যায়, গুরুতর জনস্বার্থসম্পর্কিত বিষয়ও তীব্র আলোচনার জন্ম দেওয়ার অল্প কিছুদিন পরই তা জনস্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়, হারিয়ে যায় অগণিত নতুন খবরের ভিড়ে। 

উম্মে ওয়ারা

এভাবে একক বা সম্মিলিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ খবর ভুলে যাওয়ার প্রবণতাকে বলা হয় ‘কালেকটিভ বা সোশ্যাল অ্যামনেশিয়া’ অর্থাৎ ‘সমষ্টিগত বা সামাজিক বিস্মৃতি’ (রাসেল জ্যাকবি, সোশ্যাল অ্যামনেশিয়া, ১৯৭৫)। তবে এই স্মৃতিভ্রষ্টতাকে কেবল জনমনোযোগের ক্ষণস্থায়িত্ব হিসেবে ভাবাই যথেষ্ট নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ, যাকে বাংলাদেশের সমসাময়িক প্রেক্ষাপটের লেন্সে দেখার সুযোগ আছে বলে মনে করি।  

মার্কিন অর্থনীতিবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যান্থনি ডাউন্স তাঁর ১৯৭২ সালের ‘ইস্যু অ্যাটেনশন সাইকেল’ বা ‘সমস্যা-মনোযোগ চক্র’ ধারণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে কীভাবে কোনো নির্দিষ্ট জনসচেতনতামূলক সমস্যা জনসাধারণের নজরে আসে, তীব্রতা পায় এবং একসময় জনস্মৃতি থেকে হারিয়েও যায়; বিশেষত যখন সমস্যার সমাধান অনিশ্চিত বা দীর্ঘমেয়াদি হয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই তত্ত্বের প্রয়োগ দেখা যায়, যেখানে নানা অনিয়ম-অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান, বিশ্বাসযোগ্য বা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা বা পদক্ষেপ অনুপস্থিত থাকে। 

► বাংলাদেশে সামাজিক বিস্মৃতির সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে আমরা হামের প্রাদুর্ভাব এবং এ পর্যন্ত চার শতাধিক শিশুমৃত্যুর ঘটনাটি উল্লেখ করতে পারি। 

► সমষ্টিগত বিস্মৃতি বিভিন্ন অন্যায়কে শুধু জনস্মৃতি থেকে মুছেই ফেলে না, বরং কখনো কখনো সঠিক জ্ঞান বা সত্য জানার অধিকারও কেড়ে নেয়।

► এটা কেবল জনগণের মনোযোগ বা জ্ঞানগত সীমাবদ্ধতার ফল নয়; বরং এই বিষয়ে রাষ্ট্রের অপ্রতুল প্রতিক্রিয়াই নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

অপর দিকে ফরাসি দার্শনিক মরিস হালবওয়াচসের ভাষায়, সামাজিক স্মৃতি প্রতিষ্ঠানগতভাবে পুনরুৎপাদিত না হলে তা টিকে থাকতে পারে না (অন কালেকটিভ মেমোরি, ১৯৯২)। ফলে রাষ্ট্রের জন্য বিতর্কিত ও অসুবিধাজনক পরিস্থিতির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নীরবতা বা দুর্বল প্রতিক্রিয়া সেই ঘটনাগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্মৃতিতে রূপ নিতে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে। 

এই পরিপ্রেক্ষিতে জবাবদিহির অভাব একটি দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি করে, যেখানে পুনরাবৃত্ত ঘটনার পরও জনমত ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যায় এবং ভুলে যাওয়াই একটি স্বাভাবিক সামাজিক প্রতিক্রিয়ায় পরিণত হয়। 

২.

বাংলাদেশে এই সমষ্টিগত বা সামাজিক বিস্মৃতির সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে প্রথমত আমরা হামের প্রাদুর্ভাব এবং এ পর্যন্ত চার শতাধিক শিশুমৃত্যুর ঘটনাটি উল্লেখ করতে পারি। 

মহামারির মতো হামের সংক্রমণের অন্যতম কারণ হিসেবে জানা যায়, ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার ৫০ শতাংশ টিকা ওপেন টেন্ডার মেথডে (উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি) কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। ইউনিসেফ ও তাদের অংশীদারেরা তখন উদ্বেগ জানায় যে এই প্রক্রিয়ায় সামগ্রিক ক্রয়প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত বিলম্বিত হতে পারে। 

এসব উদ্বেগ সত্ত্বেও উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে এগোনোর সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়, ফলে টিকা সংগ্রহে বিলম্ব ঘটে বলে অভিযোগ আছে। শুধু তা–ই নয়, ২০২৫ সালেই টিকাবাহকদের ৯ মাস বেতন না পাওয়া, প্রায় তিন মাসের মতো স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মবিরতিতে থাকা, স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায়ে যেতে ব্যবহৃত গাড়িতে তেল না থাকার মতো ঘটনাগুলোও ব্যাপক হারে টিকাপ্রাপ্তির সুযোগকে ব্যাহত করেছে।    

এ ছাড়া ২০২৪ সালের বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছাড়াও একাধিক কারণে ২০২৫ সালের জন্য নির্ধারিত এমআর টিকার ক্যাম্পেইন হয়নি। এই বছরের মার্চের শেষ দিকে সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাত্র ৫৯ শতাংশ শিশু হামের টিকা পেয়েছে। পরে এই তথ্য সরকারি ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। (প্রথম আলো, ২ মে, ২০২৬) 

এসব ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের অদূরদর্শিতা ও অব্যবস্থাপনার ফল ভোগ করছে শত শত নিষ্পাপ শিশু এবং তাদের পরিবার। পত্রিকার পাতায় উঠে এসেছে করুণ কাহিনি, যেখানে যমজ দুই বোনের একজনের চলে যাওয়ার ঘটনা যেমন পেয়েছি; আবার পেয়েছি বিয়ের ১১ বছর পর আরাধ্য সন্তানের মৃত্যুর খবর! 

কিন্তু খেয়াল করে দেখবেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আমরা সাধারণ জনগণ ধীরে ধীরে হামে আক্রান্ত মৃত শিশুদের ভুলতে বসেছি, মনোযোগী হয়েছি নতুন কোনো সমস্যা নিয়ে। 

৩.

এখন প্রশ্ন হলো, এই স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের ঘটনাটি জনগণের কেন্দ্রীয় মনোযোগের আড়ালে নিয়ে যেতে রাষ্ট্রও কি কোনোভাবে ভূমিকা রেখেছে?

একটু তাকাই সম্প্রতি শেষ হয়ে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের জনমুখী বিভিন্ন আলোচনার দিকে। ৩০ এপ্রিল ২০২৬–এ রাতে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হওয়া অধিবেশনটি ১২ মার্চ ২০২৬ তারিখে শুরু হয়েছিল এবং মোট ২৫ কার্যদিবস স্থায়ী ছিল।

৬ এপ্রিল সংসদ অধিবেশনের নবম বৈঠকে সংসদ সদস্য আখতার হোসেন সংসদে প্রশ্ন রাখেন যে কেন দ্রুতগতিতে শিশুদের হামের টিকার আওতায় নিয়ে আসা হয়নি? এই প্রশ্নের উত্তরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন যে টিকা ব্যবস্থাপনায় আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের অব্যবস্থাপনাই হামের প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ। 

এ ছাড়া ২২ এপ্রিল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সালাহ উদ্দিনের হাম শনাক্তকরণের কিটস্বল্পতা প্রসঙ্গে সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই সমস্যার জন্য আগের দুই সরকারকেই দায়ী করেন এবং বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের সচেষ্টতার কথাও জানান।

ত্রয়োদশ সংসদ অধিবেশন

দুঃখজনকভাবে পূর্ববর্তী সরকারের যে অব্যবস্থাপনা ও অদূরদর্শিতার কারণে শত শত শিশুর প্রাণহানি হলো, তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে আমরা কোনো রূপরেখা দেখতে পাইনি। এমনকি স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন যে জরুরি অবস্থা ঘোষণার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। 

আরও অবাক করা বিষয় হলো, বিরোধী দল জাতীয় সংসদে একবারও এই সংকটের কারণ উদ্​ঘাটনে সঠিক তদন্তের দাবি জানায়নি; একটিবারের জন্যও তারা অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেনি; যা সাধারণ নাগরিকের কাছে দৃষ্টিকটু ও অগ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদে দাঁড়িয়ে যদি জনগণের জন্য কথা না বলেন, তাহলে জনগণ কেন ভোট দিয়ে তাঁদের সংসদে পাঠিয়েছেন, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।  

সংসদে যদি হামের প্রাদুর্ভাবকে মহামারি হিসেবে ঘোষণা করা হতো, তাহলে এর কারণ, প্রভাব ও প্রতিরোধ বিষয়ে তদন্ত করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেমন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জন্য বাধ্যতামূলক হতো, ঠিক তেমনি সরকারের এই পদক্ষেপে সাধারণ জনগণও স্বস্তি পেত অনেকটাই। 

পত্রপত্রিকা ও অন্যান্য মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন স্তরের ও পেশার মানুষ হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে কথা বলছেন। কিন্তু এ বিষয় নিয়ে জাতীয় সংসদে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের জোরালো কোনো আলোচনার অনুপস্থিতি জনগণকে হতাশ করেছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে হামের উপসর্গে মৃত্যু হওয়া শিশুদের ঘটনা নিয়ে আমাদের আস্তে আস্তে ভাবলেশহীন হয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এটা কেবল জনগণের মনোযোগ বা জ্ঞানগত সীমাবদ্ধতার ফল নয়; বরং এ বিষয়ে রাষ্ট্রের অপ্রতুল প্রতিক্রিয়াই নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। 

৪.

সংসদ অধিবেশন চলাকালে গত ২৩ এপ্রিল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংঘটিত একটি নজিরবিহীন ঘটনার কথা জানা যায়। এটা হলো, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে চলতি বছরের শুরুতে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংকগুলোকে তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার তহবিল (সিএসআর) থেকে ১০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণায় দেওয়ার জন্য চাপ দেয়। 

ব্যাংকগুলোর আপত্তি সত্ত্বেও নানা চাপ ও আলোচনার পর শেষ পর্যন্ত পৌনে ৪ কোটি টাকা সংগ্রহ করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), স্টুডেন্টস এগেইনস্ট ডিসক্রিমিনেশন ফাউন্ডেশন ও ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির মতো সংগঠনকে দেওয়া হয়। এর মধ্যে একটি সংগঠনের তহবিল পাওয়ার মতো প্রয়োজনীয় নিবন্ধনও ছিল না। (বিবিসি নিউজ বাংলা, ১ মে ২০২৬)

অথচ আমরা জানি, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন গত ২৯ জানুয়ারি এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল, গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫–এর ধারা ২১ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২–এর অনুচ্ছেদ ৮৬ অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীরা গণভোটে ‘হ্যাঁ’–এর পক্ষে বা ‘না’–এর পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য জনগণকে কোনোভাবে আহ্বান জানাতে পারবেন না।

তাহলে এমন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে অন্তর্বর্তী সরকার কি জেনেশুনেই আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করেছে? আর এ কারণেই কি অন্তর্বর্তী আমলে প্রণীত গণভোট অধ্যাদেশ ২০২৫–এ ‘দায়মুক্তি’র বিধান রাখা হয়েছে? লক্ষণীয় যে গণভোট অধ্যাদেশ ২০২৫–এ ‘দায়মুক্তি’ শিরোনামে ধারা ২২ প্রণয়ন করে বলা হয়েছে, ‘এই অধ্যাদেশের অধীনে কোনো আদেশ বা নির্দেশ পালন করা কোনো কাজের জন্য কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা বা অন্য কোনো আইনগত কার্যধারা দায়ের করা যাবে না।’ 

বর্তমান সংসদের মাধ্যমে যেহেতু এই গণভোট অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে গেছে, এখন এ–সংক্রান্ত যাবতীয় অপরাধের জন্য দায়মুক্তির আর কোনো অবকাশ নেই। তবে প্রশ্ন হলো, ইসি কর্তৃক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এ ধরনের বেআইনি আর্থিক লেনদেনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের দায় নিয়ে কোনো জোরালো আলোচনা কেন জাতীয় সংসদে হলো না? 

এ ঘটনা থেকে এমনটা প্রতীয়মান হয় যে সরকার বা বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানো বা পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে এ ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও খুব সহজে জনস্মৃতি থেকে হারিয়ে গেছে।  

৫.

সংসদের প্রথম অধিবেশনের শেষ দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সমাপনী বক্তব্য দেন। এই বক্তব্যে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘সংসদে আমরা ইতিহাস নিয়ে হয়তো অনেক বিতর্ক করেছি। কিন্তু সেটি কি হামে অসুস্থ বাচ্চার মায়ের মনকে শান্ত করতে পারবে? একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে আমার মনে হয়, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক বিতর্কের চেয়ে অনেক বেশি জানতে চায় তাদের সমস্যার সমাধান বিষয়ে। তাই এই সংসদে আমরা পপুলার বিষয় নিয়ে আলাপ করব না, আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আলাপ করব।’ 

খেয়াল করে দেখুন, এই লেখায় আলোচ্য দুটি জনস্বার্থবিরোধী কাজের সিদ্ধান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হলেও এর প্রভাব পড়েছে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের আমলে। তাই দেশ ও জনগণের স্বার্থে সরকারকে আগের আমলের পাশাপাশি নিজ আমলের নানা অনিয়ম–দুর্নীতির ঘটনার সঠিক মূল্যায়ন ও সেই অনুযায়ী জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে; তাহলে হাজারো খবরের ভিড়েও জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় আর জনস্মৃতি থেকে হারিয়ে যাবে না। 

আমাদের মনে রাখতে হবে, সমষ্টিগত বিস্মৃতি বিভিন্ন অন্যায়কে শুধু জনস্মৃতি থেকে মুছেই ফেলে না; বরং কখনো কখনো সঠিক জ্ঞান বা সত্য জানার অধিকারও কেড়ে নেয়।

উম্মে ওয়ারা সহযোগী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

*মতামত লেখকের নিজস্ব