
একজন সাদামনের মানুষ হতে দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা, ধৈর্য ও পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়। লালন করতে হয় অদম্য ইচ্ছা ও স্বপ্ন। মানুষের অগোচরেও অনেকে হয়ে ওঠেন একজন সাদামনের মানুষ। যে কেউ স্বীকার করে নিতে বাধ্য হবেন, তেমনই একজন ব্যক্তি হলেন কাজী মোহাম্মদ আলী। চট্টগ্রাম শহরের হামজারবাগ এলাকার এই বাসিন্দা ৪০ বছর ধরে বিশাল সঞ্চয় গড়ে তুলেছেন গরিব মানুষের জন্য। পরিবারের বিশাল ঘানি টানতে গিয়ে নানা ঝড়-ঝঞ্ধার মধ্যেও আগলে রেখেছেন সেই সঞ্চয়। সম্প্রতি সঞ্চয়ের ৫০ লাখ টাকা শিশুদের ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য দান করে দিয়েছেন।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ৯ সন্তান নিয়ে সংসার চালাতে মাস শেষে ধারকর্জ করা লাগত মোহাম্মদ আলীর বাবার। পরিবারের দুর্দশা তো দেখেছেনই, ষাটের দশকে একটি ওষুধ কোম্পানিতে বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়ে হাসপাতালে গরিব মানুষের দুর্দশাও দেখেছেন। তখন থেকে ওষুধ ও অল্প কিছু টাকা দিয়ে রোগীদের সাহায্য করা শুরু করেন। কিন্তু অসহায় মানুষের জন্য কিছু করার বড় স্বপ্ন ছিল তাঁর। সেই উদ্দেশ্যে ১৯৮০ সাল থেকে কিছু কিছু টাকা জমাতে শুরু করলেন।
তা-ও টিনের কৌটায়। ২০০০ সালে যখন বড় একটি অঙ্ক হলো, তা মা ও বাবার নামে ব্যাংকে একটি হিসাব খুলে জমা করেন। সঞ্চয়টা বাড়াতে সেই টাকা থেকে কম সুদে পরিচিত মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ীদের টাকা ধারও দিতেন। এখন ব্যাংকের ওয়াক্ফর হিসাবের মাধ্যমে সেই টাকাটা জমা করে রেখেছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতির নামে। বছরে সেখান থেকে পাওয়া চার লাখ টাকা মুনাফা অল্প বয়সীদের ক্যানসার চিকিৎসার জন্য ব্যয় করা হবে।
মোহাম্মদ আলীর এ সঞ্চয়ের কথা পরিবারের সদস্যরা খুব একটা অবগত ছিলেন না। ২০০৫ সালে অবসর নিয়ে দুই ছেলে ও পরিবারের বাকি সদস্যদের নিয়ে সাদামাটা জীবনযাপন করেন। এরপরও বিশাল এই সঞ্চয় নিয়ে চাইলে অনেক কিছুই করতে পারতেন তিনি। শেষ বয়সে আরাম–আয়েশে থাকতে পারতেন। সন্তানদেরও দিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু সেসব কিছুই না করে শুরুর সেই স্বপ্নই পূরণ করেছেন। পরিবারের সদস্যরাও তঁার এমন কর্মকাণ্ডে গর্ববোধ করেন। কাজী মোহাম্মদ আলী বললেন, ‘আমি ৫০ ভাগ খুশি হয়েছি টাকাটা তুলে দিতে পেরে। শতভাগ শান্তি পাব, যখন শুনব এই সহায়তায় ক্যানসার আক্রান্ত কোনো শিশু চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছে।’
নানা দুর্নীতি-অনিয়মের কারণে দেশে কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে, অর্থ পাচারের ঘটনা তো নতুন কিছু নয়। কিন্তু সৎ পথে উপার্জনের বিশাল সঞ্চয় এভাবে দান করে দিয়ে উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারেন মোহাম্মদ আলীর মতো মানুষেরাই। তাঁর এমন মানবিকতায় আমরা অভিভূত, তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।