
যখন ‘গুম’ ব্যক্তিদের খোঁজে স্বজনেরা থানা-পুলিশের কাছে ধরনা দিয়েছেন, তখন তারা নির্বিকার ছিল। এঁদের কেউ তিন বছর, কেউ পাঁচ বছর কিংবা তারও আগে গুম হয়েছেন। এত দিনেও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গুম ব্যক্তিদের খোঁজখবর করা না হলেও এখন স্বজনহারা পরিবারগুলোর সদস্যদের ওপর নানা রকম চাপ দেওয়ার অভিযোগ উঠছে। এটা কেবল বেআইনি নয়, অমানবিকও।
গত শুক্রবার প্রথম আলোয় গুম ব্যক্তিদের পরিবারের করুণ কাহিনি প্রকাশিত হয়। স্বজনদের অভিযোগ, পুলিশ তাঁদের কাছ থেকে সাদা কাগজে এই বলে সই নিচ্ছে যে তাঁরা গুম হননি, নিখোঁজ হয়েছেন। যাঁরা সই দেননি, তাঁদের নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। এ খবর ছাপা হওয়ার পর ডিএমপির পক্ষ থেকে হয়রানির অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়, গুমের বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য জানতেই তারা ভুক্তভোগীদের বাড়িতে গেছে।
ডিএমপি যে ব্যাখ্যাই দিক না কেন, তাতে ভুক্তভোগী পরিবারের কষ্ট ও বেদনা লাঘব হবে না। এই মানুষগুলোকে কারা গুম করেছে? সংশ্লিষ্ট পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাদাপোশাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে তাঁদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সদস্যদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ বেশি। গুম ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ আহূত সমাবেশে ১৯টি পরিবারের সদস্যরা গত শনিবার প্রেসক্লাবে সমাবেশের আয়োজন করলে সেখানেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের ভিডিও ধারণ করেন এবং নানা প্রশ্ন করেন। একজন ভুক্তভোগীর অভিযোগ, তিনি থানায় জিডি করতে গেলে তাঁকে বের করে দেওয়া হয়েছে। জনগণের করের অর্থে জনগণের সেবায় নিয়োজিত বাহিনীর কোনো সদস্য এ রকম নিষ্ঠুর আচরণ করতে পারেন, তা অবিশ্বাস্য। তাহলে ঔপনিবেশিক আমলের পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের পুলিশ সদস্যদের পার্থক্য কোথায়?
বেসরকারি সংস্থাগুলোর উদ্ধৃতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ২০০৯ সাল থেকে ৬০০ ব্যক্তিকে বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং আরও ছয় শতাধিক ব্যক্তির গুম ও নির্যাতনের কথা উল্লেখ করেছে এবং এ জন্য র্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দায়ী করেছে তারা। দেশটি র্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাতজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে জাতিসংঘ ৩৪ জন গুম ব্যক্তির নাম-ঠিকানাসহ জানতে চেয়েছে। এরপরই সরকারের মধ্যে তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। তাদের এ তৎপরতা গুম ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার চেয়ে সংশ্লিষ্ট পরিবারের প্রতি চাপ সৃষ্টি করাই এর উদ্দেশ্য বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য হলো গুম ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি হয়রানি বন্ধ করতে হবে। সরকার তাঁদের স্বজনদের উদ্ধারে কোনো চেষ্টা না করে উল্টো চাপ সৃষ্টি করলে দেশের ভাবমূর্তি আরও নষ্ট হবে। শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা কখনো সফল হয় না। এ মুহূর্তে সরকারের উচিত গুমের প্রতিটি অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত। যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানুষ গুম করার অভিযোগ, তাদের দিয়ে তদন্ত করলে কোনো ফল পাওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে বিচার বিভাগীয় কমিটি গঠন করলে তা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে বলে আমরা মনে করি।