জনগণের উদ্বেগ দূর করুন

টিকা পাওয়া না পাওয়া

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন গত মঙ্গলবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে টেলিফোন করে চুক্তি অনুযায়ী কোভিড টিকা সরবরাহের তাগিদ দিয়েছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে। কিন্তু ভারতের কাছ থেকে কোনো আশ্বাস পাওয়া গেছে কি যায়নি, সে সম্পর্কে বিজ্ঞপ্তিতে কিছু বলা হয়নি।

টিকা নিয়ে বাংলাদেশ যে গভীর উদ্বেগে আছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর টেলিফোনে তা কিছুটা হলেও প্রকাশ পেয়েছে। তবে এর জন্য ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট যেমন দায়ী, তেমনি আমাদের নীতিনির্ধারকেরাও দায় এড়াতে পারেন না। গত বছর ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার ও বেক্সিমকো ফার্মার ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয় অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার তিন কোটি ডোজ টিকা সরবরাহের বিষয়ে। ছয় মাসের মধ্যে প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ টিকা দেওয়ার কথা, যার মধ্যে দেড় কোটি ডোজের দাম আগেই পরিশোধ করা হয়। কিন্তু সেরাম গত চার মাসে সরবরাহ করেছে মাত্র ৭০ লাখ ডোজ। ভারতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ভয়ংকর রূপ নেওয়ায় সেখানে টিকার চাহিদা বেড়ে যায় এবং দেশটি টিকা রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ভারতীয় সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, ভারত আগামী অক্টোবরের আগে টিকার বড় চালান রপ্তানি করতে পারবে না। সেরাম চলতি বছরের শেষ নাগাদ কোভ্যাক্স কর্মসূচি ও অন্যান্য দেশে টিকা রপ্তানি শুরু করতে পারে।

স্বাভাবিক কারণে বাংলাদেশের টিকা পাওয়া নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে যাঁরা টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ১৩-১৪ লাখ মানুষ দ্বিতীয় ডোজ পাবেন না। টিকার প্রথম ডোজ নেওয়ার ৮ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ নিতে হয়। সে ক্ষেত্রে জুনের মধ্যে অ্যাস্ট্রাজেনেকার উল্লিখিত পরিমাণ টিকা না এলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিপদে পড়বেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাঁদের নতুন কোনো কোম্পানির টিকা নিতে হলে আবার দুই ডোজই নিতে হবে।

সেরাম টিকা সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার পর সরকার চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উৎস থেকে টিকা সংগ্রহের জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। চীনের সঙ্গে চুক্তিও হয়েছে। কিন্তু কবে নাগাদ কী পরিমাণ টিকা আসবে, কোনো পক্ষ থেকে জানানো হয়নি। যদিও চীনের কাছ থেকে উপহার হিসেবে ৫ লাখ ডোজ টিকা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ২ জুন কোভ্যাক্স কর্মসূচির আওতায় ফাইজারের তৈরি ১ লাখ ৬ হাজার ডোজ টিকা আসবে বলে সরকার জানিয়েছে। এসব হলো সমুদ্রে গোষ্পদতুল্য। আমাদের দরকার কোটি কোটি ডোজ। আর পাওয়া যাচ্ছে ৫ লাখ ও ১ লাখ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মঙ্গলবার স্টাডি গ্রুপ অন রিজিওনাল অ্যাফেয়ার্স আয়োজিত এক ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে বলেছেন, একটিমাত্র উৎসের ওপর নির্ভর করার কারণেই টিকার সংকট দেখা দিয়েছে। ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকা কর্মসূচির আওতায় আনার যে পরিকল্পনা সরকার নিয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে হলে ২৫-২৬ কোটি ডোজ টিকার প্রয়োজন হবে। এই বিপুল পরিমাণ ডোজ টিকার জন্য কেবল আমদানির ওপর নির্ভর করলে হবে না, ভারত অভ্যন্তরীণ কারণ দেখিয়ে চুক্তি হওয়ার পরও টিকা সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। ভবিষ্যতে অন্য কোনো দেশ যে তা করবে না, তার নিশ্চয়তা কী। তাই দেশে টিকা উৎপাদনের প্রক্রিয়া যত দ্রুত শুরু হবে, ততই মঙ্গল।

টিকা পাওয়া নিয়ে জনগণ দুশ্চিন্তায় আছে। সরকার এ মুহূর্তে টিকা দিতে না পারলেও কবে পারবে, সে কথা বলুক।