সংসদে স্বাস্থ্যসেবা প্রসঙ্গ

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আশ্বাসই যথেষ্ট নয়

সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

গত রোববার বাজেট অধিবেশনের শুরুর দিনে জাতীয় সংসদে এক অদ্ভুত মতৈক্য লক্ষ করা গেছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিরোধী বিএনপি, জাতীয় পার্টি, গণফোরাম ও বিকল্পধারার অন্তত নয়জন সংসদ সদস্য এক সুরে সরকারের স্বাস্থ্যসেবার করুণ চিত্র তুলে ধরেছেন এবং প্রতিকারের জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

পটুয়াখালীর সংসদ সদস্য এস এম শাহজাদা প্রশ্নোত্তর পর্বে সম্পূরক প্রশ্ন করতে গিয়ে বলেন, ‘গলাচিপাতে যে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি আছে, সেটা জীর্ণশীর্ণ অবস্থায় আছে। এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভেতরে একাধিক ভবন রয়েছে। সেগুলো জীর্ণশীর্ণ হওয়ায় পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।’ দুই উপজেলার স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনা করা হয় এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে।

জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ জেলা সদরের হাসপাতালগুলোতে আধুনিক ভৌত অবকাঠামো নির্মিত হলেও অভিজ্ঞ লোকবল না থাকার অভিযোগ করে বলেছেন,উপজেলা হাসপাতালে রোগী গেলে তাদের জেলা হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

জেলা হাসপাতালে গেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ঢাকায়। বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ সরকারি হাসপাতালে কবে নাগাদ চিকিৎসক-সংকট কাটবে জানতে চেয়েছেন। বিকল্পধারার সংসদ সদস্য আবদুল মান্নান বলেন, তাঁর নির্বাচনী এলাকায় উপজেলা হাসপাতালে প্রসূতিদের অপারেশন হচ্ছে না বলে নালিশ করেছেন। সরকারি দলের সংসদ সদস্য শাজাহান খানের অভিযোগ, তাঁর এলাকায় আড়াই শ শয্যার হাসপাতাল হলেও ৫০ শয্যার চিকিৎসক দিয়ে চলছে।

সংসদ সদস্যদের অভিযোগ অস্বীকার করেননি স্বাস্থ্যমন্ত্রী। রীতি অনুযায়ী স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব সংসদ সদস্যর প্রশ্নের গতানুগতিক জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যেসব হাসপাতাল ভবন জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে, সেগুলো মেরামত করা হবে, যেসব হাসপাতালে লোকবলের সংকট আছে, তা-ও দূর করা হবে।

কিন্তু কবে করা হবে, সে সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি। ফলে মন্ত্রীর আশ্বাসে উল্লিখিত এলাকার মানুষ তো বটেই, সংসদ সদস্যরাও আশ্বস্ত হতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। মন্ত্রী যত আশ্বাসই দেন না কেন, ২০০১ সাল থেকে কোনো হাসপাতালের ডায়ালাইসিস ও ক্যানসার যন্ত্র অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকার কোনো ব্যাখ্যা কি তিনি দিতে পারবেন? কেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো না? চিকিৎসাসেবার এই অত্যাবশ্যকীয় যন্ত্রপাতি যদি ব্যবহারই করা না হবে, তাহলে জনগণের করের অর্থে কেনা হলো কেন?

স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন, সরকারি হাসপাতালের অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবার কারণেই মানুষ অনেক বেশি অর্থ খরচ করে বেসরকারি হাসপাতালে যেতে বাধ্য হন। কিন্তু যাঁদের সেই সামর্থ্য নেই, তাঁরা স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হন। উন্নত দেশ দূরে থাক, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের হার সর্বনিম্ন। এরপরও স্বাস্থ্য খাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা করতে পারে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তাহলে মানুষ স্বাস্থ্যসেবা কীভাবে পাবে?

দেশের বিভিন্ন স্থানে হাসপাতাল, বিশেষ করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর এ অবস্থা চলতে দেওয়া যায় না। স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কেবল পটুয়াখালীর গলাচিপার সংসদ সদস্য ‘চিপায়’ নেই, অনেক এলাকার সংসদ সদস্যরাই ‘চিপায়’ আছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে জনগণ আর আশ্বাস শুনতে চায় না। দ্রুত অবকাঠামো মেরামতসহ হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, এটাই দেখতে চায়।