সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

ধীরগতির শহর ও সড়কে মৃত্যু

শৃঙ্খলাবদ্ধ গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলুন

রাজধানী ঢাকা বিশ্বের অন্যতম ধীরগতির শহর। যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকা এই নগরীতে বাসের গড় গতি কখনো ঘণ্টায় ৯ দশমিক ৭ কিলোমিটার, আবার ব্যস্ত সময়ে তা ৫ থেকে ৭ কিলোমিটারে নেমে আসে। কয়েক বছর আগের বুয়েটের গবেষণা বলছে, ঢাকার সড়কে যানবাহনের গড় গতি এখন প্রায় মানুষের হাঁটার গতির সমান। এমন এক শহরে যেখানে যানবাহনের স্বাভাবিক গতিই প্রায় থেমে গেছে, সেখানে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা এত বেশি হওয়া এক গভীর বৈপরীত্য। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সর্বশেষ পরিসংখ্যান সেই বৈপরীত্যকে আরও নির্মমভাবে সামনে এনেছে।

সংস্থাটির হিসাবে, ২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত রাজধানীতে ১ হাজার ৮৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৩৮৪ জন এবং আহত হয়েছেন ২ হাজার ৪৮৮ জন। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো নিহত ব্যক্তিদের প্রায় ৮২ শতাংশই পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহী। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৯২ জন পথচারী এবং ৫৩৬ জন মোটরসাইকেল আরোহী। এই পরিসংখ্যান শুধু দুর্ঘটনার নয়, এটি নগর পরিকল্পনা, পরিবহনব্যবস্থা এবং সড়ক ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের ব্যর্থতারও প্রতিচ্ছবি।

রাজধানীতে দুর্ঘটনার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় রাত। মোট মৃত্যুর ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশই ঘটেছে রাতে। এরপরই রয়েছে সকাল। যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মোহাম্মদপুর, কুড়িল বিশ্বরোড ও বিমানবন্দর এলাকা দুর্ঘটনার হটস্পট হয়ে উঠেছে। রাত ১০টা থেকে ভোর পর্যন্ত ভারী মালবাহী যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল এবং ফাঁকা সড়কে অতিরিক্ত গতির প্রবণতা পথচারীদের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করছে। দিনের বেলায় দীর্ঘ যানজটের কারণে চালকদের ধৈর্যচ্যুতি ও আক্রমণাত্মক আচরণও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে।

সিগন্যাল ছেড়ে দিলেই ঢাকার সড়কে অনেক চালক বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। আবার বাসে যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা, রুটে আধিপত্য বিস্তার এবং নিয়ন্ত্রণহীন প্রতিযোগিতাও দুর্ঘটনা বাড়ায়। এগুলো কোনো অনিবার্য বাস্তবতা নয়, বরং দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির ফল। পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা, পাশাপাশি বিআরটিএ, বিআরটিসি, ডিটিসিএ, সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন। এই সুপারিশগুলো নতুন নয়, কিন্তু বাস্তবায়নের অভাবই সবচেয়ে বড় সংকট।

পরিবহনবিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদীউজ্জামানের মতে, ঢাকায় এত দিন যত বিনিয়োগ হয়েছে, তার প্রায় সবই যানবাহনের জন্য; পথচারীদের জন্য সেভাবে বিনিয়োগ হয়নি। অথচ এই শহরে প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ হেঁটেই কর্মস্থল বা প্রয়োজনীয় গন্তব্যে যান। তাঁর এই বক্তব্য আমাদের নগর উন্নয়নের এক মৌলিক সমস্যা সামনে আনে। উড়ালসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে বা নতুন সড়ক নির্মাণের চেয়ে নিরাপদ ফুটপাত, কার্যকর জেব্রা ক্রসিং, পর্যাপ্ত পদচারী–সেতু, সিগন্যালনির্ভর নিরাপদ পারাপার এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

মোটরসাইকেলের ওপর অতিনির্ভরতার অন্যতম কারণ গণপরিবহনের দুরবস্থা। যখন বাসে ওঠা কষ্টকর, নির্দিষ্ট সময়ের নিশ্চয়তা নেই, যাত্রা অস্বস্তিকর এবং রুটব্যবস্থা বিশৃঙ্খল; তখন মানুষ বাধ্য হয়ে মোটরসাইকেলের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফলে নিরাপত্তাঝুঁকিও বাড়ে।

সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে শুধু আইন প্রয়োগ বা জরিমানা বাড়ানো যথেষ্ট নয়; গণপরিবহনকে নির্ভরযোগ্য, সময়নিষ্ঠ, নিরাপদ ও আরামদায়ক করে তুলতে হবে। রুট রেশনালাইজেশন, কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা, চালকদের প্রশিক্ষণ ও কর্মঘণ্টার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এবং যাত্রীবান্ধব বাসব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। রাজধানীর ধীরগতির সড়কে দ্রুত মৃত্যুর মিছিল থামাতে হলে মানুষকেন্দ্রিক নগর পরিকল্পনা, পথচারীবান্ধব অবকাঠামো এবং আধুনিক, শৃঙ্খলাবদ্ধ গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।