সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

হালদার বিপন্ন ডলফিন

ইঞ্জিনের নৌকা চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে

দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননকেন্দ্র হালদা নদী থেকে আরও একটি মৃত ডলফিনের উদ্ধার হওয়া কেবল একটি প্রাণীর মৃত্যু নয়, বরং এটি আমাদের সামগ্রিক নদী ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার করুণ চিত্র। গত মঙ্গলবার হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে প্রায় ৯১ কেজি ওজনের পচে যাওয়া যে ডলফিনটি উদ্ধার করা হয়েছে, তা নদীটির জীববৈচিত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রে এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা।

পরিসংখ্যান বলছে, গত সাড়ে ছয় বছরে হালদা নদীতে অন্তত ৫১টি ডলফিনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে গত ১৪ মাসেই মারা গেছে ৬টি। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) লাল তালিকাভুক্ত এই ‘অতিবিপন্ন’ প্রজাতির প্রাণীর এমন গণমৃত্যু কোনো স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে না। বিশ্বজুড়ে এই গঙ্গার শুশুক বা ডলফিনের সংখ্যা যেখানে মাত্র ১ হাজার ১০০টি, সেখানে এক হালদাতেই ছিল ১৭০টি। কিন্তু একের পর এক মৃত্যুর মিছিলে এই সংখ্যা দ্রুত কমে আসছে, যা নদী ও প্রাণিবিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।

হালদা–গবেষকদের মতে, এই ডলফিনগুলো নদীর পরিবেশের সুস্থতার নির্দেশক। একের পর এক ডলফিন মরে যাওয়ার অর্থ হলো নদীর পানিতে বিষাক্ততা বেড়েছে অথবা মানুষের তৈরি কোনো মরণফাঁদ তাদের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। প্রায়ই দেখা যায়, বালুবাহী নৌযানের প্রপেলারের আঘাত কিংবা অসাধু শিকারিদের জালে আটকে এই বিরল ডলফিনগুলো প্রাণ হারায়। নদী ও মানুষের এই দ্বন্দ্বে যখন ডলফিনের মতো নিরীহ প্রজাতি পরাজিত হয়, তখন দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়ে নদীর প্রাকৃতিক প্রজননক্ষমতা।

ডলফিনের সুরক্ষায় এবং হালদা নদী রক্ষায় কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতেই হবে। হালদার নির্দিষ্ট এলাকায় বালুবাহী ড্রেজার বা ইঞ্জিনচালিত নৌযান চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে ডলফিনগুলো যান্ত্রিক আঘাত থেকে রক্ষা পায়। শিল্পবর্জ্য বা অন্য কোনো কারণে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। নৌ পুলিশের টহল জোরদার করার পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে স্পর্শকাতর এলাকাগুলো পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। হালদাপারের বাসিন্দাদের মধ্যে ডলফিনের গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে, যাতে তাঁরা কোনো মৃত ডলফিন দেখলে দ্রুত খবর দিতে পারেন এবং সংরক্ষণে সহায়তা করেন। প্রতিটি ডলফিনের মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করে যদি কোনো অবহেলা বা অপরাধ প্রমাণিত হয়, তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

হালদা ডলফিনশূন্য হয়ে পড়া মানে কেবল একটি নদীর ক্ষতি নয়, এটি বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি। কর্তৃপক্ষ যদি এখনই সজাগ না হয়, অনেক বিলুপ্ত মাছের মতো অদূর ভবিষ্যতে হালদা ‘নদীর প্রাণ’ ডলফিনও কেবল কঙ্কাল হয়ে গবেষণাগারে ঠাঁই পাবে।