সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

জ্বালানিসংকট বনাম সর্বোচ্চ মজুত

ফুয়েল পাস দ্রুত সারা দেশে চালু করা হোক

ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়, যুদ্ধবিরতি ও পরবর্তী পরিস্থিতিতেও তার আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি হয়নি। এই সংকট বাংলাদেশে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, তা থেকেও শিগগিরই মুক্তি মিলছে না। আবার সরকার থেকে যেসব বক্তব্য আসছে এবং মাঠপর্যায়ে যে বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে, তা সাংঘর্ষিক। জ্বালানি তেলের সংকট নেই দাবি করা হলেও পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাকে অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদেরা।

যুদ্ধ থেকে যুদ্ধবিরতি ও পরবর্তী পরিস্থিতিতে নানা ধাপে হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। কখনো হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করে দেওয়া, কখনো বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কখনো অনেক বেড়েছে, আবার কখনো কিছুটা কমেছে। এদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে গতকাল সরকার জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়িয়েছে।

দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬৩ শতাংশই ডিজেলনির্ভর। পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের মূল চালিকা শক্তি এই জ্বালানি। সরকার শুরু থেকে বলে আসছে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। কিন্তু রাজধানী থেকে শুরু করে প্রান্তিক কৃষিজমি—সর্বত্রই জ্বালানি তেলের জন্য হাহাকার ও দীর্ঘ অপেক্ষার করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে।

ডিজেল-সংকটের ফলে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদনসক্ষমতা ২৫-৩০ শতাংশ কমে গেছে বলে উদ্যোক্তারা দাবি করছেন। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থা বিরাজ করছে কৃষি খাতে। বোরো আবাদের ভরা মৌসুমে সেচযন্ত্রের ডিজেলের জন্য পাম্পে পাম্পে ড্রাম নিয়ে কৃষকদের দিনরাত অপেক্ষা করা সত্ত্বেও তেল না পাওয়া প্রমাণ করে যে সরবরাহ-শৃঙ্খলে বড় ধরনের ফাটল ধরেছে।

রাজধানী ঢাকার ফিলিং স্টেশনগুলোর চিত্র আরও করুণ। একেকটি পাম্পে শত শত যানবাহন ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছে। ছুটির দিনে বিশ্রাম বা পরিবারকে সময় দেওয়ার বদলে তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এখন সাধারণ মানুষের রুটিন কাজ হয়ে পড়েছে। পাম্পগুলো রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি করলেও তা খুব একটা কাজে আসছে না।

সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া তথ্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে ফারাক লক্ষ করা যাচ্ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী দাবি করছেন, দেশে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পরিমাণ পরিশোধিত তেলের মজুত আছে এবং এপ্রিল-মে মাসের জন্য কোনো শঙ্কা নেই। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, যদি পর্যাপ্ত মজুত থাকেই, তবে পাম্পগুলোতে তেলের জন্য মানুষের এই দীর্ঘ লাইন কেন? কেন ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অপরিশোধিত তেলের অভাবে উৎপাদন বন্ধের উপক্রম হয়েছে? লোডশেডিংয়ের দাপ্তরিক তথ্য এবং জনগণের অভিজ্ঞতার মধ্যেও রয়েছে যোজন যোজন দূরত্ব। বিরোধীদলীয় নেতাসহ নাগরিক সমাজ ও জনমনে প্রশ্ন—জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকট না থাকলে লোডশেডিং কেন?

চট্টগ্রাম বন্দরে ১ লাখ ৪১ হাজার টন ডিজেল নিয়ে চারটি ট্যাংকার আসার খবর কিছুটা আশাব্যঞ্জক হলেও, এটি কেবল সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে মজুতের পরিসংখ্যান দিয়ে সংকটের গভীরতাকে আড়াল করার সুযোগ নেই। ঢাকাসহ সাতটি জেলায় ফুয়েল পাসের কার্যক্রম চালু হয়েছে। আরও আগে এমন পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি ছিল। দেরিতে হলেও এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এ কার্যক্রম এখন দ্রুত গোটা দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে। শুধু ব্যক্তিমালিকানাধীন ছাড়াও কোম্পানি মালিকানার মোটরসাইকেল এবং অন্যান্য মোটরগাড়িও এ কার্যক্রমে যুক্ত করার বিষয়ে বিবেচনা করা হোক।

সরবরাহব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা ও মজুতদারি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া এ সংকটকালীন পরিস্থিতি উত্তরণের কোনো পথ নেই। কৃষি ও শিল্প খাত সচল রাখতে জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে আরও বেশি সচেষ্ট হতে হবে।