নতুন উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে গাজীপুরে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গত রোববার ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির-সমর্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে দিনভর উত্তেজনা ও দফায় দফায় সংঘাতের পর শিক্ষার্থীদের ব্লকেড কর্মসূচি ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। ছাত্রদলের অভিযোগ, সাবেক উপাচার্যের দুর্নীতি ধামাচাপা দিতে ছাত্রশিবিরের এই আন্দোলন। অন্যদিকে ছাত্রশিবির দাবি করেছে, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীরা’ যৌক্তিক আন্দোলন করছেন। রাজনৈতিক শিক্ষার্থীদের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানে শেষ পর্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়ছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন।
বিএনপি সরকার গঠনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যদের সরিয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দিচ্ছে। এই ধারাবাহিকতায় ১৫ মে ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ডুয়েটের উপাচার্য করা হয় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) অধ্যাপক মোহাম্মদ ইকবালকে।
প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, নতুন উপাচার্য নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই ডুয়েটের একদল শিক্ষার্থী এর বিরোধিতা করে আন্দোলন শুরু করেন। তাঁদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষকদের মধ্য থেকে কাউকে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হোক। সাধারণ শিক্ষার্থীদের নামে আন্দোলন হলেও এর সঙ্গে ছাত্রশিবিরের সক্রিয় নেতা-কর্মীদের দেখা যায়। গত রোববার নতুন উপাচার্যের ক্যাম্পাসে আসাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘাতে প্রায় ২০ শিক্ষার্থী আহত হন। এরপর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ব্লকেড কর্মসূচি ঘোষণা করলে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রমে স্থবিরতা নামে।
অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উপাচার্য নিয়োগের বিরোধিতা করে শিক্ষার্থীদের একাংশ যে আন্দোলন করছে, তার যৌক্তিকতা কতটুকু? এর আগে ডুয়েটে যে সাতজন উপাচার্য দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁদের চারজনই অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা। আমরা মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির অবস্থানটাও যথেষ্ট যৌক্তিক নয়। তারা একদিকে বলছে উপাচার্য নিয়োগে নিয়মের কোনো ব্যত্যয় হয়নি; অন্যদিকে বলছে, শুরু থেকে আমাদের দাবি ছিল, এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কাউকে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হোক।
এ ব্যাপারে কারও দ্বিমত থাকার কোনো অবকাশ নেই যে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় সংকট হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জাতীয় রাজনীতির সম্প্রসারিত ক্ষেত্র করে তোলা। যে সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, তারা তাদের অনুগত শিক্ষকদের উপাচার্যসহ প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেয়। এখানে মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যই প্রাধান্য পায়। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও এই রাজনৈতিক বিবেচনা ক্রিয়াশীল থাকায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান ক্রমেই নিম্নগামী হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে উপাচার্য থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে সংস্কার আসবে বলেই সবার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক নিয়োগের ধারাবাহিকতা দেখা গেছে। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত তিন মাসে আগের ধারাবাহিকতাতেই ২০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছে। এর মধ্যে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে উপাচার্য নিয়োগ থেকে শুরু করে নিপীড়ন ও গবেষণা জালিয়াতির অভিযোগ থাকা অধ্যাপককেও উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
রাজনৈতিক বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগের এই সংস্কৃতির পরিবর্তন না হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মান বাড়বে বলে আমরা মনে করি না। সরকারকে অবশ্যই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কারের দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। ডুয়েটে যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই তার সমাধান হতে হবে। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশের স্বার্থেই এ অচলাবস্থার দ্রুত অবসান হওয়া জরুরি।