উদ্বোধনের পর প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও দুই সরকারি সংস্থার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও টানাপোড়েনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক কীভাবে সাধারণ মানুষের জন্য নরকযন্ত্রণা হয়ে উঠতে পারে, তার এক আদর্শ উদাহরণ চট্টগ্রামের ‘অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়ক’। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নির্মিত ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ের এই পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটির বর্তমান জরাজীর্ণ দশা এবং তা নিয়ে সিডিএ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) কাদা–ছোড়াছুড়ি কেবল অনভিপ্রেত নয়, বরং চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার শামিল।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দুই সংস্থার রশি–টানাটানির জেরে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সড়কটির কার্পেটিং উঠে এখন সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। অবস্থা এতটাই বেগতিক যে বৃষ্টি না থাকলেও রাস্তাটি পানির নিচে তলিয়ে থাকে এবং ভুক্তভোগী চালকদের ক্ষোভের ভাষায়, এটিকে আর রাস্তা নয়, মনে হয় ‘বিল’।
বিগত এক দশকে এই সড়কের দুই পাশে ব্যাপক নগরায়ণ হয়েছে। একটি বেসরকারি হাসপাতাল, ১০টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অসংখ্য আবাসিক ও ব্যবসায়িক ভবন গড়ে উঠেছে এখানে। অনন্যা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা ছাড়াও হাটহাজারী, রাউজান এবং রাঙামাটির কাপ্তাইয়ের হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন এই সড়ক ব্যবহার করেন। অথচ জনগুরুত্বপূর্ণ এই পথের বকসুনগর, ওয়াজেদিয়া মোড় বা তামান্না বিল্ডিং এলাকার মতো অন্তত ছয়টি স্থানে এখন মরণফাঁদ তৈরি হয়ে আছে। জমে থাকা পানির নিচে গর্তের গভীরতা বুঝতে না পেরে প্রতিনিয়ত উল্টে যাচ্ছে মোটরসাইকেল, বিকল হচ্ছে রিকশা ও অটোরিকশার ইঞ্জিন। স্কুলগামী শিশু আর অফিসগামী মানুষের প্রাত্যহিক এই ভোগান্তি কোনো সভ্য নগরের চিত্র হতে পারে না।
এই অচলাবস্থার মূল কারণ সড়কটির মালিকানা হস্তান্তর নিয়ে দুই সংস্থার অনড় অবস্থান। সিডিএ সড়কটি চসিকের ঘাড়ে চাপাতে চায়, অন্যদিকে চসিকের যুক্তি—এমন ধ্বংসস্তূপের দায়িত্ব তারা নেবে না, সিডিএকে হয় সড়কটি সম্পূর্ণ মেরামত করে দিতে হবে, নয়তো পুনর্নির্মাণের অর্থ দিতে হবে। দুই সংস্থার গঠিত যৌথ কমিটিও চসিকের দাবির পক্ষে সুপারিশ করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, দুই সরকারি প্রতিষ্ঠানের এই অনমনীয় অবস্থানের মাশুল কেন সাধারণ নাগরিকেরা তাঁদের সময়, অর্থ ও দুর্ঘটনা-ঝুঁকি দিয়ে দেবেন? একটি প্রকল্প শেষ হওয়ার পর তা রক্ষণাবেক্ষণের স্থায়ী আইনি রূপরেখা কী হবে, তা শুরুতেই নির্ধারিত কেন থাকে না?
সিডিএর বর্তমান চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, দ্রুত সংস্কার শেষ করেই সড়কটি হস্তান্তর করা হবে। আমরা আশা করব, এই আশ্বাস যেন স্রেফ কথার কথা না হয়ে দ্রুত বাস্তবায়িত হয়। শুধু জোড়াতালির সংস্কার নয়, সড়কটির টেকসই পুনর্নির্মাণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনেরও উচিত হবে আমলাতান্ত্রিক অজুহাত পাশে সরিয়ে জনস্বার্থে দ্রুত এই সড়কের দায়িত্ব গ্রহণ করা।