সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা

অপ্রয়োজনীয় গবেষণাকেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দিন

দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণায় গুরুত্বহীনতার বিষয়টি কারও অজানা নয়। এ ক্ষেত্রে গবেষণায় অপ্রতুল বরাদ্দ, পরিকল্পনাহীনতা, সদিচ্ছার অভাব, দলীয় রাজনীতি লেজুড়বৃত্তিসহ নানা বিষয় প্রভাব ফেলে। এরপরও দেশে উচ্চশিক্ষার শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা নিয়ে যে আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা থাকে, সেখানেও হতাশ হতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষণাকেন্দ্রগুলো এখন কেবল নামমাত্র ‘টিকে’ আছে। এর মধ্য দিয়েই প্রতীয়মান হয়, দেশে গবেষণামূলক কর্মকাণ্ড কতটা পিছিয়ে আছে।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ৬১টি গবেষণাকেন্দ্রের অধিকাংশই নিষ্ক্রিয়। অনেকগুলোর নেই নিজস্ব অফিস, নেই পরিচালক, নেই নিয়মিত গবেষণা কার্যক্রম। অনেকগুলো কেবল বছরে দু-একটি সেমিনার বা কর্মশালা আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বহু কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রমহীন থাকলেও সেগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে বহাল তবিয়তেই রয়ে গেছে। কোথাও পরিচালকের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু নতুন নিয়োগ হয়নি। কোথাও কোনো গঠনতন্ত্রই নেই। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বা দলীয় স্বার্থে কোনো কোনো গবেষণাকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে এবং গবেষণার বদলে সেগুলো ব্যবহৃত হয়েছে অন্য উদ্দেশ্যে।

সার্চ কমিটি ইতিমধ্যে ৮ থেকে ১০টি গবেষণাকেন্দ্র বন্ধের সুপারিশ করেছে। এটি একটি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। নিষ্ক্রিয় কেন্দ্র বন্ধ করা কোনো ব্যর্থতা নয়; বরং বাস্তবতা মেনে নেওয়ার সাহসী সিদ্ধান্ত। যেসব কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে কোনো গবেষণা করছে না, যাদের কাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য পূরণে সহায়ক নয়, সেগুলো টিকিয়ে রাখার কোনো যুক্তি নেই; বরং এই কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে সক্রিয় ও সম্ভাবনাময় কেন্দ্রগুলোর বরাদ্দ বাড়ানোই হবে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত।

অন্যদিকে একই সময়ে নতুন নতুন গবেষণাকেন্দ্র খোলার আবেদনও জমা পড়ছে। বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত না করে নতুন কেন্দ্র গড়ার প্রবণতা সমস্যাকে আরও বাড়াবে। গবেষণাকেন্দ্রের সংখ্যা নয়, প্রয়োজন মানসম্পন্ন গবেষণা, আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য প্রাসঙ্গিক জ্ঞান উৎপাদন।

গবেষণাকেন্দ্রগুলোর জন্য বরাদ্দ দেওয়া অর্থের পুরোটা খরচও হচ্ছে না, অর্থাৎ সমস্যার মূল কারণ কেবল অর্থের অভাব নয়, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, পরিকল্পনার ঘাটতি ও জবাবদিহির অভাবও বড় কারণ।

এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রথমে একটি স্পষ্ট নীতিগত সিদ্ধান্ত দরকার। কোন গবেষণাকেন্দ্র কেন থাকবে, কী ধরনের গবেষণা করবে, তার ফলাফল কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে। পরিচালকের নিয়োগে স্বচ্ছতা আনতে হবে এবং গবেষণার মানকে প্রধান মানদণ্ড করতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার জন্য গবেষকদের প্রণোদনা ও স্বীকৃতি বাড়ানো জরুরি।

আমরা আশা করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকেন্দ্রগুলো সত্যিকার অর্থে গবেষণার জায়গা হয়ে উঠবে। নয়তো এ সংকট শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, পুরো দেশের জ্ঞানভিত্তিক ভবিষ্যতের সংকট হয়ে দাঁড়াবে। কারণ, সত্যিকারে গবেষণা ছাড়া টেকসই ও স্বাধীন চিন্তার সমাজ গড়ে ওঠে না।