সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

মহান স্বাধীনতা দিবস

গণতন্ত্রের ভিত সুদৃঢ় হোক

আজ মহান স্বাধীনতা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হয় এবং ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। এই স্বাধীনতার জন্য লাখো মানুষ জীবন দিয়েছেন। অসংখ্য মা-বোন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

স্বাধীনতার এই দিনে আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি সেই বীর সন্তানদের, যাঁরা দেশের জন্য আত্মোৎসর্গ করেছেন। স্মরণ করি শেখ মুজিবুর রহমানকে, যিনি ধীরে ধীরে একটি জনগোষ্ঠীকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছেন এবং সে পথে তাদের এগিয়ে নিয়ে গেছেন। স্মরণ করি মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী জাতীয় চার নেতাকে। আমরা স্মরণ করি জিয়াউর রহমানকে, বেতারে যাঁর স্বাধীনতার ঘোষণা সে সময় দিশাহারা জনগণকে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল।

স্বাধীনতার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও শোষণমুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। আমাদের সংবিধানেও সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য এবং স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। এর পেছনে সুশাসনের ঘাটতি যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতাও। স্বাধীনতার পর থেকে যেসব রাজনৈতিক দল দেশ শাসনের ভার নিয়েছে, তারা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার ফল হিসেবেই গণ–আন্দোলন, গণ–অভ্যুত্থান আমাদের ইতিহাসে বারবার ফিরে এসেছে। ২০২৪ সালে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির কারণ হয়ে উঠেছিল কর্তৃত্ববাদী শাসন, জনগণের ভোটাধিকার হরণ এবং সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাট।

যূথবদ্ধ সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলটিও নাগরিকদের জন্য স্বস্তিদায়ক ছিল না। তবে চব্বিশের জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থান বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক পথে নিয়ে যাওয়ার বড় সম্ভাবনা তৈরি করে দিয়েছিল। এর ধারাবাহিকতাতেই অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে গত ১২ ফেব্রুয়ারি একটি পরিচ্ছন্ন, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দুই–তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি।

দায়িত্ব নেওয়ার পর বিএনপি সরকার ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড চালু, খাল খনন কর্মসূচিসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আইনের শাসনের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সরকারি দল ও বিরোধী দলের অংশগ্রহণে একটি কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠার কথাও বলেছেন। নাগরিক সমাজ এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দিকে লক্ষ রাখবে।

এ দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক রায়ের প্রতি পাকিস্তানি শাসকদের অবজ্ঞা ও অস্বীকৃতিই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি তৈরি করে দিয়েছিল। অথচ সংসদীয় গণতন্ত্রকে এখন পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যায়নি। আমরা আশা করি, বর্তমান সংসদের সরকারি দল ও বিরোধী দল দুই পক্ষই জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে এবং জাতীয় সংসদকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তুলবে।

একটা ভেঙে পড়া অর্থনীতি ঠিক পথে আনা এবং প্রশাসন, আদালত, দুদক, নির্বাচন কমিশনসহ দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্ষম করে তোলার মতো বড় চ্যালেঞ্জ নতুন সরকারের সামনে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ এবং মূল্যস্ফীতির চাপ সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসাটাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি তেল ও গ্যাসের বাজার অস্থির হয়ে পড়ায় নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এসব বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য সবার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। আমরা মনে করি, সব মত ও পথের মানুষের অধিকার সমুন্নত করাটাই সামাজিক ঐক্য ও স্থিতিশীলতা অর্জনের সবচেয়ে ভালো উপায়।

একটি কার্যকর ও টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে সংবিধানে বর্ণিত প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। এবারের স্বাধীনতা দিবসের অঙ্গীকার হোক গণতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় করা। স্বাধীনতা দিবস সবার জন্য সুখ ও সমৃদ্ধি বয়ে আনুক।

সবাইকে স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা।