সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

সড়ক পরিবহনে চাঁদাবাজি

মন্ত্রীর বক্তব্য সরকারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের কথা খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন। এ প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের পরিবহন খাতের চাঁদাবাজিকে সমঝোতার ভিত্তিতে লেনদেন হিসেবে আখ্যায়িত করার বিষয়টি সরকারের নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই আমরা মনে করি। এই ধরনের বক্তব্যে একদিকে যেমন নতুন সরকার নিয়ে নাগরিকদের মাঝে ভুল বার্তা যায়, অন্যদিকে পরিবহন খাতে যারা অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িত, তাদেরও উৎসাহিত করে।

প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, বৃহস্পতিবার সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রথম সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী বলেন, পরিবহন খাতে টাকাটা সমঝোতার ভিত্তিতে তোলা হচ্ছে। জোর করে আদায় করা হচ্ছে না। এ জন্য এটিকে চাঁদা বলা যাচ্ছে না। মন্ত্রী নিজেই যেখানে তাঁর বক্তব্যে কল্যাণের নামে তোলা টাকার কতটা কল্যাণে ব্যবহৃত হয় তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং শ্রমিক সংগঠনে যে দল ক্ষমতায় থাকে তার একটা আধিপত্য থাকে বলে স্বীকার করেছেন, সেখানে কোন নৈতিক যুক্তির বলে এটিকে সমঝোতার লেনদেন বলছেন, সেটা নাগরিকদের কাছে বোধগম্য নয়। এখানে প্রশ্ন ওঠাটা তাই স্বাভাবিক যে মন্ত্রী কি ‘সমঝোতা’ বলে চাঁদাবাজিকে বৈধতা দিলেন?

সড়ক পরিবহনব্যবস্থার নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা বাংলাদেশের নাগরিকদের সীমাহীন দুর্ভোগ ও ট্র্যাজেডির বড় কারণ। সড়কে প্রতিদিন গড়ে ২৫ জনের বেশি মানুষ নিহত হন, যাঁদের বেশির ভাগই তরুণ ও কর্মক্ষম। সড়কে এই মৃত্যুর মিছিল নিছক দুর্ঘটনা নয়, বরং কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড। ২০২৪ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় দেখা যায়, ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস ও মিনিবাস থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়।

এ ছাড়া পণ্য পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত ট্রাক, মিনি ট্রাক থেকেও বিপুল অঙ্কের চাঁদা তোলা হয়। যে দল যখন ক্ষমতায় থাকে, তাদের প্রভাবপুষ্ট পরিবহনমালিক ও শ্রমিকদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পায়। সড়ক পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রক রাজনৈতিক এই প্রভাবশালীদের সঙ্গে পুলিশ ও বিআরটিএর অসাধু কর্মকর্তাদের একটা অসাধু আঁতাত গড়ে ওঠে। সড়কে বিশৃঙ্খলার পেছনে এই দুর্নীতিপুষ্ট ব্যবস্থা ও চাঁদাবাজিই মূল দায়ী। এখানে গোষ্ঠীবদ্ধ স্বার্থের নির্মম বলি হতে হয় নাগরিকদের।

অতীতে নানা সময়ে পরিবহন খাতের চাঁদাবাজিকে বৈধতা দেওয়ার একধরনের চেষ্টা দেখা গেছে। নাগরিক সমাজের প্রতিবাদের মুখে সেটা বন্ধ হলেও পরিবহন খাতকে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির হাত থেকে কোনো সরকারই মুক্ত করার উদ্যোগ নেয়নি। পরিবহন খাতে পরিচালন ব্যয়ের বাইরে চাঁদা কিংবা কল্যাণ যে নামেই টাকা তোলা হোক না কেন, তাতে জনগণের ঘাড়ে বাড়তি ব্যয়ের চাপ এসে পড়ে। রাস্তায় রাস্তায় চাঁদার কারণে পরিবহন ভাড়ার সঙ্গে নিত্যপণ্যের দামও বেড়ে যায়। বাংলাদেশে যে নৈরাজ্যিক পরিবহন খাত, তার বড় ভুক্তভোগী চালক ও সহকারীরাও। আইন অনুযায়ী তাঁদের নিয়োগপত্র এবং মাসিক বেতন দেওয়া নিশ্চিত করাটাই সবচেয়ে বড় শ্রমিক কল্যাণ।

আমরা মনে করি, সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো সরকারের একটি বড় দায়িত্ব। এ খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির শিকড় না উপড়াতে পারলে শৃঙ্খলা ফেরাতে যে পদক্ষেপ নেওয়া হোক না কেন, সেটা কোনো ফলই আনতে পারবে না। সড়কে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হলে সরকারকে শুরু থেকেই শক্ত বার্তা দেওয়ার বিকল্প পথ নেই।