সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

একজন বাবুল শেখ

গাজীপুরে অসাধারণ মানবিক দৃষ্টান্ত

বৃষ্টির দিনে কোলের শিশুকে আগলে রাখা এক অসচ্ছল মায়ের নিরুপায় অবস্থা দেখে থমকে গিয়েছিলেন গাজীপুরের কাপাসিয়ার দিনমজুর বাবুল শেখ। সেই একটি দৃশ্যই তাঁর মধ্যে জাগিয়ে তুলেছিল গভীর নাগরিক দায়বদ্ধতা ও সহমর্মিতা। নিজের কষ্টার্জিত সামান্য অর্থ ও শারীরিক শ্রমে কাঠ, বাঁশ, চাটাই আর পলিথিনের সাহায্যে একের পর এক ১১টি যাত্রীছাউনি এবং একটি শৌচাগার গড়ে তুলেছেন তিনি। অনটন আর সংসারের টানাপোড়েন থাকা সত্ত্বেও একজন দিনমজুরের এমন নিঃস্বার্থ উদ্যোগ কেবল প্রশংসনীয়ই নয়; বরং আমাদের সামাজিক অবকাঠামো ও প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য এক বড় বার্তা।

নিজের সংসার সামলাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে যাত্রীদের স্বস্তির কথা ভেবে কয়েক হাজার টাকা ব্যয় করা এবং মানুষের বিরূপ মন্তব্যকে উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাওয়া সহজ কথা নয়। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়াহীন এসব বাঁশ-চাটাইয়ের ছাউনির অর্থনৈতিক মূল্য হয়তো সামান্য, কিন্তু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর মূল্য অপরিসীম। প্রতিদিন রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়া শত শত পথচারী ও যাত্রীর স্বস্তি বাবুল শেখের এই নিভৃত প্রচেষ্টাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

তবে বাবুল শেখের এই উজ্জ্বল উদ্যোগের আড়ালে আমাদের গণপরিষেবার এক বিষাদময় চিত্রও ফুটে ওঠে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানের আওতাধীন সড়কগুলোতে যাত্রীদের বসার ন্যূনতম ব্যবস্থা বা শৌচাগার না থাকা আমাদের পরিবহনব্যবস্থার ঘাটতিকেই নির্দেশ করে। অবকাঠামোগত নানা প্রাতিষ্ঠানিক প্রকল্পের কথা বলা হলেও গণপরিবহনের সাধারণ যাত্রীদের এই প্রাথমিক চাহিদার বিষয়টি সরকারি নজরদারিতে প্রায়ই বাদ পড়ে যায়। স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা এই উদ্যোগের প্রশংসা করলেও এই প্রশ্ন থেকেই যায়—যে দায়িত্ব সরকারি সংস্থাগুলোর পালন করার কথা ছিল, তা কেন একজন নিঃসম্বল দিনমজুরের কাঁধে গিয়ে পড়ল?

বাবুল শেখ আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন যে জনসেবা বা সমাজ পরিবর্তনের জন্য বিপুল অর্থের চেয়ে সদিচ্ছা ও অনুভূতির মন থাকাটা বেশি জরুরি। এখন স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সড়ক কর্তৃপক্ষের উচিত বাবুল শেখের গড়া এই কাঁচা ছাউনিগুলোকে স্থায়ী রূপ দেওয়া এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেওয়া। একই সঙ্গে কাপাসিয়াসহ দেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক সড়কের পাশে পথচারী ও যাত্রীদের জন্য সমন্বিত বিশ্রামাগার ও শৌচাগার নির্মাণের ব্যবস্থা করা উচিত, যাতে কোনো বাবুল শেখকে আর ব্যক্তিগত খরচে পলিথিন টাঙিয়ে পথচারীদের রক্ষা করতে না হয়।