সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কৌশল

সীমিত আয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়বে

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নতুন কিছু নয়। কিন্তু এবার যে কৌশলে দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা শুধু আরেক দফা মূল্যবৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি বিদ্যুৎ খাতের নীতিগত চরিত্র বদলে দেওয়ার ইঙ্গিতও বহন করছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) শুধু ইউনিটপ্রতি দাম বাড়াতে চায় না, একই সঙ্গে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা ধাপভিত্তিক (স্ল্যাব) সুবিধার কাঠামোও পরিবর্তন করতে চাইছে। এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা আসবে নিম্নমধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর ওপর।

বর্তমানে বিদ্যুতের স্ল্যাব কাঠামো এমনভাবে নির্ধারিত যে কম ব্যবহারকারীরা কিছুটা সুরক্ষা পান। ৫০ ইউনিট পর্যন্ত লাইফলাইন গ্রাহক এবং ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত প্রথম ধাপের গ্রাহকেরা কম দামে বিদ্যুৎ পান।  আমরা মনে করি, এই দুই ধাপে দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। 

কিন্তু পিডিবির নতুন প্রস্তাবে ৭৬ ইউনিট পার হলেই পুরো ২০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারের উচ্চ হারে হিসাব হবে। অর্থাৎ একজন গ্রাহক যদি ৮০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তবে তিনি আর প্রথম ৭৫ ইউনিটের কম মূল্যের সুবিধা পাবেন না। এটি মূলত ধাপভিত্তিক সুবিধার মৌলিক নীতির সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।

পিডিবি বলছে, গরিব মানুষের ওপর চাপ না বাড়াতেই এ পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের বড় একটি অংশ এখন এমন এক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত, যেখানে শুধু একটি ফ্যান ও একটি বাতি দিয়ে সংসার চলে না। একটি ফ্রিজ, কয়েকটি বাতি, ফ্যান ও একটি টেলিভিশন এখন আর বিলাসিতা নয়; এগুলো ন্যূনতম নাগরিক জীবনের অংশ। ফলে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট ব্যবহারকারী যে ২৩ শতাংশ গ্রাহক নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির, তাঁদের ওপর এই সিদ্ধান্ত সরাসরি বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করবে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, পিডিবি নিজেই হিসাব দিয়েছে—এই স্ল্যাব পরিবর্তনের মাধ্যমে বছরে অতিরিক্ত ২ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা আয় সম্ভব। অর্থাৎ উদ্দেশ্য যে মূলত রাজস্ব বাড়ানো, সেটি গোপন থাকছে না। প্রশ্ন হলো, এই বাড়তি অর্থের দায় কেন শুধু ভোক্তাদের ওপর চাপানো হবে? বিদ্যুৎ খাতের সংকটের মূল কারণ কি সত্যিই সাধারণ গ্রাহকের অতিরিক্ত ব্যবহার? বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। 

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চাহিদার তুলনায় বিপুল উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে, যার বড় অংশই এসেছে বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় দরপত্রবিহীন চুক্তির মাধ্যমে। এর ফলে সরকারকে বিপুল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে; বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও কেন্দ্রগুলোর ভাড়া গুনতে হচ্ছে জনগণের করের টাকায়। এ অবস্থায় খরচ কমানোর বদলে গ্রাহকের ঘাড়ে দায় চাপানো সহজ পথ হতে পারে, কিন্তু তা ন্যায়সংগত নয়। 

পিডিবি আরও একটি প্রস্তাব দিয়েছে—প্রতি ছয় মাসে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করা। জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। এটি বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক ধারণা হতে পারে; কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় এর ঝুঁকি অনেক। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলেই যদি বিদ্যুতের দাম বাড়ে, তবে তা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরও তীব্র করবে। 

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতকে টেকসই করতে হলে প্রথমেই দরকার আস্থার পুনর্গঠন। মানুষ তখনই মূল্যবৃদ্ধি মেনে নেয়, যখন তারা দেখে রাষ্ট্রও অপচয় ও দুর্নীতি কমাতে আন্তরিক। কিন্তু যখন অস্বাভাবিক দামে বিদ্যুৎ কেনা হয়, অদক্ষ পরিকল্পনার দায় বহন করে জনগণ, তখন নতুন করে স্ল্যাব পরিবর্তনের মতো সিদ্ধান্ত মানুষের কাছে অন্যায্য বলেই প্রতীয়মান হবে। সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত হবে মূল্যবৃদ্ধির আগে বিদ্যুৎ খাতের অভ্যন্তরীণ সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া। তা না হলে এই বাড়তি চাপ শেষ পর্যন্ত শুধু বিদ্যুৎ বিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাকেও বাড়িয়ে তুলবে।