প্রচার শেষ, অপেক্ষা ভোটের

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করাটাই ইসির মূল চ্যালেঞ্জ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা শেষ হচ্ছে আজ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে সাতটায়। আগামী বৃহস্পতিবার দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত একযোগে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থান বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক পথে নিয়ে যাওয়ার যে বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, সেই পটভূমিতে এবারের নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিগত সরকারের আমলে পরপর তিনটি অগ্রহণযোগ্য ও বিতর্কিত নির্বাচনের কারণে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) গ্রহণযোগ্যতা তলানিতে নেমেছে। এই অবস্থান থেকে ঘুরে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির ঘুরে দাঁড়ানোর জন্যও একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সবচেয়ে জরুরি কর্তব্য।

গত ১২ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হওয়া ও প্রতীক বরাদ্দের পর ২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা শুরু করেন রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও সমর্থকেরা। সমাবেশ, মিছিল, মাইক, লিফলেট, ব্যানার, ফেস্টুন নানা উপায়ে দল ও প্রার্থীরা তাঁদের প্রচারণা চালিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এবারের নির্বাচনী প্রচারণার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা সারা দেশে নির্বাচনী জনসভায় নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। শেষ সময়ে ইশতেহার ঘোষণা করে নির্বাচিত হলে কোন দল কী করবে, সেই প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।

সব মিলিয়ে কিছু সহিংসতা ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের পরও এবারের নির্বাচনী প্রচারণা পর্বটা ছিল প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও উৎসবমুখর। ভোটাররা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য। ভয়হীন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটাররা যাতে তাঁদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন, তা নির্বাচন কমিশন, অন্তর্বর্তী সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিশ্চিত করতে হবে। 

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও গণভোটের জন্য নির্বাচন কমিশন সব প্রস্তুতি শেষ করলেও ভোটের দিন এবং ভোট-পরবর্তী কয়েক দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সুষ্ঠু রাখাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে আমরা মনে করি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) তথ্যমতে, তফসিল ঘোষণার পর বিভিন্ন আসনে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৫ জন নিহত হয়েছেন। অনেক আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, নির্বাচনের দিন সহিংসতার প্রবণতা অনেক বেড়ে যায়। নির্বাচন কমিশন এবং সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবশ্যই নির্বাচনকেন্দ্রিক যেকোনো সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে হবে।

এবারের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ১ লাখ ৮ হাজার সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যসহ অন্যান্য বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় প্রায় ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়েছে সরকার। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় তিন বাহিনীকে যুক্ত করায় এবারের নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ভোটকেন্দ্রেও দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। সব মিলিয়ে প্রস্তুতি সন্তোষজনক হলেও যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্তই সহিংসতা এড়াতে সহায়তা করবে বলে আমরা মনে করি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপতথ্য, গুজব, ডিপফেক ভিডিও যেন সহিংসতা উসকে দিতে এবং ভোটের পরিবেশ বিঘ্নিত করতে না পারে, সে ব্যাপারে ইসিকে সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে। প্রতিদ্বন্দ্বী সব দল, প্রার্থী ও সমর্থকদের আচরণবিধি মেনে চলতে হবে। সবাইকে মনে রাখতে হবে যে নির্বাচন কমিশন, অন্তর্বর্তী সরকার, রাজনৈতিক দল, সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত অন্যান্য বাহিনী সব পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকাই পারে একটি উৎসবমুখর, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে।