হামলায় র‍্যাব সদস্যের মৃত্যু

সলিমপুরে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতেই হবে

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সন্ত্রাসীদের হামলায় র‍্যাবের একজন কর্মকর্তা নিহত ও তিনজন আহত হওয়ার ঘটনাকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা এবং দেশের অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ কম। এরপরও আমরা মনে করি, জঙ্গল সলিমপুরের মতো অঞ্চল, যেখানে সন্ত্রাসী ও অপরাধী গোষ্ঠী দুর্ধর্ষ ও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, সেখানে অভিযানে যাওয়ার আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত কৌশল ও পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন ছিল। র‍্যাব কর্মকর্তা আবদুল মোতালেব জীবন দিয়েই সেটা প্রমাণ করলেন। আমরা তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি শোক ও সমবেদনা জানাই।

কাগজে-কলমে সীতাকুণ্ড উপজেলার অন্তর্ভুক্ত হলেও জঙ্গল সলিমপুর ভৌগোলিকভাবে চট্টগ্রাম নগরীর সন্নিকটে। ৩ হাজার ১০০ একরের এ অঞ্চল চার দশকের বেশি সময় ধরে সরকারের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়ে গেছে। যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তাদের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যু গোষ্ঠীগুলো এখানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে আসছে। অঞ্চলটিতে ঢুকতে গেলে আলাদা পাস দরকার হয়। প্রবেশপথগুলো পাহারা দেয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। দুর্গম এ অঞ্চল অস্ত্র, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধ ও অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। এর আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছে। সাংবাদিকেরা সংবাদ সংগ্রহে গিয়েও মারধরের শিকার হয়েছেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও এই চিত্রের ব্যতিক্রম হয়নি। চব্বিশের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পুরোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে নতুন গোষ্ঠীর কয়েক দফা সংঘর্ষ ও খুনোখুনির ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের অক্টোবর মাসে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে জঙ্গল সলিমপুরের বাস্তব চিত্র বিস্তারিতভাবে উঠে আসে। প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা ‘সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যুশাসিত’ অঞ্চলটি রক্ষার জন্য সরকারের সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন বলে আমরা সম্পাদকীয়ও লিখেছি। অন্তর্বর্তী সরকার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেই প্রতিবেদন ও সম্পাদকীয় আমলে নিলে গত সোমবারের দুঃখজনক ঘটনা না-ও ঘটতে পারত।

প্রথম আলোর খবর থেকে এটা স্পষ্ট, সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিত ও সংঘবদ্ধভাবে র‍্যাবের সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়েছে। র‍্যাবের দুটি মাইক্রোবাস জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে লাঠিসোঁটা ও অস্ত্র নিয়ে হামলা করা হয়। মাইকে ঘোষণা দিয়েই সন্ত্রাসীদের জড়ো করা হয়। সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে গুলি চালায়। র‍্যাবের ওপর হামলার সঙ্গে যারাই জড়িত, তাদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

জঙ্গল সলিমপুর অঞ্চলে সন্ত্রাসীরা এমন বেপরোয়া হয়ে ওঠার মূল কারণ হলো সেখানকার পাহাড় ও বন কেটে গড়ে ওঠা বিশাল অঙ্কের প্লট-বাণিজ্য। বর্তমান বাজারমূল্যে সেখানকার খাসজমির মূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। কয়েক দশক ধরে ভূমিহীন লোকদের কাছে ভূমিদস্যুরা পাহাড় ও বন দেদার উজাড় করে প্লট আকারে সেখানকার জমি বিক্রি করেছে।

র‍্যাবের ওপর সন্ত্রাসীদের হামলার ঘটনা জঙ্গল সলিমপুরকে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আনার বাধ্যবাধকতাকে আবারও সামনে নিয়ে এল। এ রকম সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যুশাসিত অঞ্চলের উপস্থিতি রাষ্ট্র ও সরকারের কর্তৃত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। গত চার দশকে সরকারগুলো জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে দেখেও চোখ বন্ধ রাখার যে নীতিতে চলেছে, তার ফলে কয়েক হাজার মানুষের বসতি গড়ে ওঠাসহ সেখানকার সার্বিক পরিস্থিতি ক্রমে জটিল হয়ে উঠেছে। কিন্তু তাই বলে একটি অঞ্চলকে সন্ত্রাসী, অপরাধী ও ভূমিদস্যু গোষ্ঠীর কাছে সঁপে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

অন্তর্বর্তী সরকার জঙ্গল সলিমপুরে সব বাহিনী মিলে সমন্বিত অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছে। আমরা মনে করি, সরকারকে অবশ্যই জঙ্গল সলিমপুরে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যুরা যে রাজনৈতিক শক্তির প্রশ্রয়ই পাক না কেন, তাদের একবিন্দুও ছাড় দেওয়া চলবে না।