পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি জেলার গহিন বনে কচুর মুখি চাষের জন্য যেভাবে মাইলের পর মাইল বন পুড়িয়ে ন্যাড়া করা হচ্ছে, তা কেবল উদ্বেগজনকই নয়; পরিবেশের ওপর এক অপূরণীয় আঘাত। প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা, পানছড়িসহ বিভিন্ন উপজেলায় শত শত একর প্রাকৃতিক বন আগুনে পুড়িয়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। পুড়ে যাওয়া গাছের কালো গুঁড়িগুলো দেখলে মনে হয়, সেখানে যেন এক সুপরিকল্পিত ‘গাছের গণহত্যা’ চালানো হয়েছে।
এই নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞের সবচেয়ে বড় শিকার পাহাড়ি জীববৈচিত্র্য ও বন্য প্রাণী। পিটাছড়ার এই গহিন বনে লজ্জাবতী বানর, উল্টোলেজি বানর, মেছো বিড়াল, চিতা বিড়াল, রাজগোখরা, হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপসহ অন্তত ১৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ২৭ প্রজাতির সাপ এবং ১৫০ প্রজাতির পাখির আবাসস্থল রয়েছে। বন পোড়ানোর ফলে এসব প্রাণী আজ বাসস্থান হারিয়ে লোকালয়ে চলে আসছে এবং মানুষের হাতে নির্মমভাবে মারা পড়ছে।
বিশ্ব জীববৈচিত্র্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘ইন্দো-বার্মা হটস্পট’-এর অংশ এই অঞ্চলের এমন বিপর্যয় কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। বন অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, গত এক দশকে দেশে কমে যাওয়া ১ লাখ হেক্টর বনের মধ্যে ৮০ হাজার হেক্টরই কমেছে পার্বত্য অঞ্চলে। কাসাভা, পামগাছ কিংবা বাণিজ্যিক কচু চাষের নামে এই লুণ্ঠনই এর প্রধান কারণ।
আশির দশকে পাহাড়ে পুনর্বাসিত পরিবারগুলোকে দেওয়া ভূমির ‘কবুলিয়ত’ বা দলিলের স্পষ্ট শর্ত ছিল—এই জমি কোনোভাবেই ইজারা বা লাগিয়ত করা যাবে না কিংবা বর্গাদার দিয়ে চাষ করানো যাবে না। অথচ মাত্র কয়েক হাজার টাকার বিনিময়ে সেই শর্ত ভেঙে পাহাড় ইজারা নিয়ে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা বহিরাগতরা শ্রমিক দিয়ে বনের পর বন পুড়িয়ে দিচ্ছে।
খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক এই বেআইনি ইজারা ও বন পোড়ানোর খবর পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন; কিন্তু দৃশ্যমান কোনো কঠোর আইনি পদক্ষেপ দেখা যায়নি। অন্যদিকে জমিগুলো ‘সরকারি রিজার্ভ বন’ না হওয়ার অজুহাতে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কোনো দায় নিতে রাজি নন, অথচ বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন পুরো দেশের জন্যই সমভাবে প্রযোজ্য।
পাহাড়ের প্রান্তিক মানুষের জীবন-জীবিকার সংকটকে পুঁজি করে বড় বড় ব্যবসায়ীরা এই ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছেন। এর স্থায়ী সমাধানে যেমন কঠোর আইনি তদারকি প্রয়োজন, তেমনি স্থানীয় মানুষের জন্য পরিবেশবান্ধব বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি। জেলা প্রশাসন, পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং পরিবেশবিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে অবিলম্বে একটি কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ক্ষণস্থায়ী বাণিজ্যিক মুনাফার জন্য খাগড়াছড়ির বন ও বন্য প্রাণীর এই সর্বনাশ বন্ধ করতে হবে।