সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

পাহাড়ে ফল চাষ

খাগড়াছড়ির জন্য সমন্বিত উদ্যোগ দরকার

পার্বত্য চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরেই দেশের ফল উৎপাদনের এক সম্ভাবনাময় ভূখণ্ড। ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, পাহাড়ি মাটি এবং ভিন্নধর্মী জলবায়ু মিলিয়ে এই অঞ্চল স্বাভাবিকভাবেই বহুমুখী ফল চাষের জন্য উপযোগী। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও সেই সম্ভাবনার বাস্তব প্রতিফলন তুলে ধরে। তিন বছরে ফল উৎপাদন ১০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পাওয়া নিঃসন্দেহে ইতিবাচক অগ্রগতি। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে একটি অসম বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রথম আলোর খবরে এসেছে, বান্দরবান ও রাঙামাটি এগিয়ে গেলেও ফল উৎপাদনে খাগড়াছড়ি পিছিয়ে পড়ছে ধারাবাহিকভাবে।

এই বৈষম্য কেবল পরিসংখ্যানগত নয়, বরং কাঠামোগত। একই ভৌগোলিক অঞ্চলের অংশ হওয়া সত্ত্বেও তিন জেলার মধ্যে উৎপাদনের এই পার্থক্য আমাদের নীতি ও বাস্তবায়নের দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে আসে। বান্দরবানে যেখানে পরিকল্পিত উদ্যোগ, বাণিজ্যিক বাগান এবং নতুন ফলের পরীক্ষামূলক চাষের বিস্তার ঘটেছে, সেখানে খাগড়াছড়ি এখনো মূলত ছোট পরিসরের, পরিবারভিত্তিক চাষে সীমাবদ্ধ।

খাগড়াছড়ির এই পিছিয়ে পড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ সুস্পষ্ট। প্রথমত, সেচব্যবস্থার ঘাটতি। পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টিনির্ভর কৃষি দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই নয়। খরার সময় ফলন কমে যায়, গাছের ক্ষতি হয়। দ্বিতীয়ত, যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা। উৎপাদিত ফল বাজারে পৌঁছাতে না পারলে কৃষকের আগ্রহ কমে যাওয়া স্বাভাবিক। তৃতীয়ত, সংরক্ষণ ও বাজার অবকাঠামোর অভাব। ফল দ্রুত নষ্ট হওয়ায় ন্যায্যমূল্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। চতুর্থত, বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনের অভাব। উচ্চ মূল্যের ফল যেমন ড্রাগন বা কাজুবাদাম নিয়ে যে উদ্যোগ অন্য জেলাগুলোতে দেখা যাচ্ছে, খাগড়াছড়িতে তা তুলনামূলক অনুপস্থিত।

এই সমস্যাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। এগুলো পরস্পর সংযুক্ত এবং সমাধানও তা–ই সমন্বিত হওয়া প্রয়োজন। কেবল চারা বিতরণ বা প্রশিক্ষণ দিয়ে এই ব্যবধান কমানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, যেখানে সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, পাহাড়ি সড়ক সংস্কার, হিমাগার ও সংগ্রহকেন্দ্র স্থাপন এবং বাজার সংযোগ জোরদার একসঙ্গে অগ্রাধিকার পাবে।

একই সঙ্গে স্থানীয় চাষিদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেও নজর দিতে হবে। স্বল্প সুদে ঋণ, সহায়ক ভর্তুকি ও কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ খাগড়াছড়িতে ফল চাষকে বাণিজ্যিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত স্থানীয় মাটি ও জলবায়ুর উপযোগী জাত উদ্ভাবন এবং রোগবালাই ব্যবস্থাপনায় মাঠপর্যায়ে কার্যকর সহায়তা দেওয়া।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে তিন জেলার মধ্যে এই বৈষম্য দূর করা জরুরি। খাগড়াছড়িকে পিছিয়ে রেখে এই অঞ্চলের সম্ভাবনাকে পূর্ণাঙ্গভাবে কাজে লাগানো সম্ভব নয়। এখন প্রয়োজন লক্ষ্যভিত্তিক হস্তক্ষেপ ও সমন্বিত নীতি প্রয়োগ। পাহাড়ের সম্ভাবনা তখনই বাস্তবে রূপ নেবে, যখন উন্নয়ন হবে সুষম, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই।