সড়কে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা কতটা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, গত শুক্রবার সিলেট ও বগুড়ায় ১৬ জনের প্রাণহানির ঘটনা সেটা বলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। সিলেটে দুর্ঘটনায় একজন বাউলশিল্পীসহ ৯ জন এবং বগুড়ায় ৭ জন নিহত হয়েছেন। সিলেটে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষের যে ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে এটা স্পষ্ট যে চালকদের বেপরোয়া চালনার কাছে যাত্রীদের, এমনকি তাঁদের জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টি নিতান্তই তুচ্ছ। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, দুই চালকের চোখেই ছিল ঘুম। বগুড়ার নিহত সবাই শ্রমজীবী। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন কাজের সন্ধানে, কিন্তু দ্রুতগতির বাস তাঁদের পিষে যায়।
সড়ক দুর্ঘটনার তথ্যগুলো পর্যবেক্ষণ করে এমন সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও দুর্ঘটনা ও হতাহতের উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, চলতি বছর ৩ হাজার ৭৫২টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩ হাজার ৩৮৭ জন। শুধু জুলাই মাসেই নিহত হয়েছেন ৪১৬ জন, আহত হয়েছেন ৬২৯ জন। সংবাদমাধ্যমের খবরের ওপর ভিত্তি করে এই পরিসংখ্যান তৈরি করে সংগঠনটি। ফলে বাস্তব চিত্র এর চেয়েও ভয়াবহ।
সড়ক পরিবহনব্যবস্থার নৈরাজ্য বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের নাগরিকদের ট্র্যাজেডি ও অসন্তোষের কারণ হয়ে রয়েছে। এটা অনস্বীকার্য যে সড়ক পরিবহন খাতে যে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব, সেটাই নৈরাজ্যের সবচেয়ে বড় কারণ। আগের সরকারগুলো নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও এবং সড়ক অবকাঠামো খাতে বিপুল ব্যয় করার পরও নিছক কিছু গোষ্ঠীর স্বার্থে সড়কে বিশৃঙ্খলা বন্ধে লোকদেখানো পদক্ষেপের বাইরে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ২০১৮ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ছিল পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, এমন অভূতপূর্ব আন্দোলনের পর কিশোর শিক্ষার্থীদের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করা হয়নি।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণ বলছে, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে সকালে। সিলেট ও বগুড়ার দুর্ঘটনা দুটিও ঘটেছে সকালে। দূরপাল্লার পরিবহনে চালকদের বিরামহীনভাবে গাড়ি চালাতে বাধ্য করার কারণেই এমন দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ যে পরিবহন খাতের শাসনহীনতা, এ ব্যাপারে কারোরই দ্বিমত থাকার কোনো কারণ নেই। ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন, অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক, ত্রুটিপূর্ণ ও ভাঙাচোরা সড়ক, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটির সক্ষমতার ঘাটতি—এসব কারণেই যে সড়ক দুর্ঘটনা আর প্রাণহানি ঘটে, সেটা সবারই জানা। সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনার বিষয়টি তাই সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের পরিসংখ্যানে শীর্ষে থাকছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। জুলাই মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের এক-তৃতীয়াংশই ছিলেন মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী। চার চাকার যানের চেয়ে মোটরসাইকেল ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। গত সাড়ে ছয় বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা গেছেন প্রায় ১৫ হাজার ৭০০ জন। উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, তাঁদের অর্ধেকের বেশি ১৩-৩৫ বছর বয়সের মধ্যে। এর অর্থ আমাদের তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীই সড়ক নৈরাজ্যের সবচেয়ে বড় শিকার।
শুধু মানসম্মত হেলমেট নিশ্চিত করা গেলেই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানি প্রায় ৪৮ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। এটা জেনেও মানহীন হেলমেট আমদানি ও ব্যবহার বন্ধ করা যায়নি। আমরা মনে করি, এখানে সবচেয়ে বড় নীতিগত ব্যর্থতা হলো, মোটরসাইকেলকে গণপরিবহনের বিকল্প করে তোলা হয়েছে। মহাসড়কে ভারী ও দ্রুতগতির যানের সঙ্গে হালকা যান মোটরসাইকেল পাশাপাশি চলতে দেওয়া কোনোভাবেই বিজ্ঞানসম্মত নয়।