সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

শ্যামনগরের গ্রাম পাঠাগার

ছোট উদ্যোগে বড় পরিবর্তন

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অবকাঠামোর অভাব নতুন কোনো বাস্তবতা নয়। এই প্রেক্ষাপটে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের সোয়ালিয়া গ্রামে গড়ে ওঠা পাবলিক লাইব্রেরি যেন হয়ে উঠেছে অভূতপূর্ব সামাজিক আন্দোলনের নাম। প্রথম আলোর খবরে এসেছে, অজপাড়াগাঁয়ের একটি ছোট ভবন কীভাবে একটি বৃহত্তর অঞ্চলের আলোর উৎস হয়ে উঠতে পারে, তার বাস্তব উদাহরণ এই উদ্যোগ।

দিনমজুরনির্ভর ছয়টি গ্রামের মাঝখানে দাঁড়িয়ে লাইব্রেরিটি শিশু ও তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। এখানে বই পড়া হয়, কিন্তু তার বাইরেও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, শীতবস্ত্র সহায়তা, বৃক্ষরোপণ অভিযান, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, রচনা, শব্দার্থ, টাইপিং ও বই পড়ার প্রতিযোগিতা নিয়মিত আয়োজন করা হয়। অর্থাৎ পাঠাগারটি জ্ঞানচর্চাকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন গ্রামের সন্তান আবু সাঈদ। ইউরোপে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সময় নেওয়া পরিকল্পনা তিনি দেশে ফিরে বাস্তবায়ন করেছেন নিজস্ব সম্পদ ও নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। ব্যক্তিগত আয়ের একটি অংশ ব্যয় করে এবং দেশি–বিদেশি সহযোগিতা নিয়ে তিনি যে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, তা আমাদের উন্নয়ন ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করে। এটি দেখায় উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণ নয়, একই সঙ্গে মানবসম্পদে বিনিয়োগই টেকসই পরিবর্তনের ভিত্তি।

লাইব্রেরিতে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ বই রয়েছে। সংখ্যার চেয়ে বড় বিষয় হলো ব্যবহারের সংস্কৃতি তৈরি হওয়া। শিক্ষার্থীরা এখানে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সাহিত্য, প্রবন্ধ ও সাধারণ জ্ঞানের বই পড়ছে। প্রতিযোগিতা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্ব ও যোগাযোগ দক্ষতা অর্জন করছে। এটি গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থার একটি কার্যকর সম্পূরক মডেল।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো সামাজিক প্রভাব। পাঠাগারটির মাধ্যমে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া রোধ, উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন জাগানো এবং দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের পাশে দাঁড়ানোর বাস্তব উদাহরণ ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে। যশোর মেডিকেল কলেজ থেকে সদ্য উত্তীর্ণ একজন চিকিৎসকের সাফল্যের পেছনে এই লাইব্রেরির ভূমিকা তার প্রমাণ। একটি পাঠাগার যে ব্যক্তির জীবনপথ বদলে দিতে পারে, তা এখানে দৃশ্যমান।

সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন পরিকল্পনায় গ্রামের লাইব্রেরিকে নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। স্থানীয় উদ্যোগকে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেওয়া, বই ও প্রযুক্তি সংযোজন, প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ এবং এমন মডেলকে অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নীতিগত পদক্ষেপ জরুরি। অজপাড়াগাঁয়ে যদি একটি ছোট লাইব্রেরি সামাজিক পরিবর্তনের অনুঘটক হতে পারে, তবে পরিকল্পিত সহায়তায় তা আরও বহুগুণ প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে।

সোয়ালিয়া পাবলিক লাইব্রেরি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি পাঠাগার কেবল নিষ্প্রাণ ঘর নয়; এটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারখানা। গ্রামবাংলার উন্নয়নে এমন উদ্যোগই হতে পারে নীরব বিপ্লবের সূচনা।