সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

মানহীন হেলমেটে বাড়ছে ঝুঁকি 

দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা নিন  

দেশে মোটরসাইকেলের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত প্রায় ৬৬ লাখ যানবাহনের মধ্যে ৪৮ লাখ ৭১ হাজারই মোটরসাইকেল। অর্থাৎ মোট যানবাহনের প্রায় ৭৪ শতাংশ মোটরসাইকেল। গত বছর ৩ হাজার ২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৭২ জন নিহত হয়েছেন। সড়কে মোট মৃত্যুর ৩৬ শতাংশই ঘটেছে এসব দুর্ঘটনায়। এমন বাস্তবতায় মোটরসাইকেলচালক ও আরোহীদের নিরাপত্তায় মানসম্মত হেলমেটের কোনো বিকল্প নেই।

কিন্তু দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া হেলমেটের বড় অংশই মানহীন। কোথাও কোথাও মাত্র ১৫০ টাকায়ও হেলমেট পাওয়া যায়। এসব হেলমেটের অনেকগুলো আসলে পাতলা প্লাস্টিকের টুপি। দুর্ঘটনায় মাথা রক্ষা করার কোনো সক্ষমতাই এগুলোর নেই। আইনি ঝামেলা ও পুলিশের মামলা থেকে বাঁচার জন্য চালক ও আরোহীদের অনেকে এগুলো ব্যবহার করেন। অর্থাৎ হেলমেট ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য—জীবন রক্ষা করার বিষয়টি পুরোপুরি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।

মানসম্মত হেলমেট মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৪৮ শতাংশ কমাতে পারে। বিপরীতে মানহীন হেলমেট নিরাপত্তার মিথ্যা ধারণা তৈরি করে। দুর্ঘটনার সময় সেটি ভেঙে গিয়ে কিংবা মাথা থেকে খুলে গিয়ে আরোহীর আঘাত আরও গুরুতর করতে পারে। তাই শুধু মাথায় হেলমেট থাকলেই আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণ হয়েছে—এমন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। হেলমেটটি নিরাপত্তার নির্ধারিত মান পূরণ করছে কি না, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আরও উদ্বেগজনক হলো বাজারে মানচিহ্নযুক্ত হেলমেট পাওয়া গেলেও তার একটি অংশ পরীক্ষায় অকৃতকার্য হচ্ছে। সম্প্রতি ছয় মাসে পরীক্ষা করা ৪৯টি নমুনার মধ্যে ১২টি গুণগত মানে উত্তীর্ণ হয়নি। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ২৪ শতাংশ নমুনা ছিল মানহীন। প্রশ্ন হলো, অনুমোদনহীন বা মানহীন এসব হেলমেট বাজারে প্রবেশ করছে কীভাবে? একটি চালান থেকে মাত্র একটি নমুনা পরীক্ষা করে পুরো চালান বাজারজাত করার অনুমতি দেওয়ার বিদ্যমান পদ্ধতিও পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

দোকানদারেরা ক্রেতার চাহিদার যুক্তি দিয়ে মানহীন হেলমেট বিক্রির দায় এড়াতে পারেন না। জীবন রক্ষাকারী সামগ্রীর ক্ষেত্রে ‘মানুষ কেনে বলেই বিক্রি করি’—এমন বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। উৎপাদক, আমদানিকারক, পরিবেশক ও বিক্রেতা—প্রত্যেকের দায় নির্ধারণ করতে হবে। মানহীন হেলমেট আমদানি, উৎপাদন ও বিক্রির জন্য কঠোর আর্থিক জরিমানা, পণ্য জব্দ এবং পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রে ব্যবসার অনুমতি বাতিলের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

পুলিশের দায়িত্বও শুধু হেলমেট আছে কি না, দেখা নয়। হেলমেটটি দৃশ্যত নিরাপত্তার উপযোগী কি না, তার মানচিহ্ন রয়েছে কি না—সেটিও প্রাথমিকভাবে যাচাই করতে হবে। তবে সড়কে চালক বা যাত্রীকে জরিমানা করাই একমাত্র সমাধান হতে পারে না। নিয়ন্ত্রণের মূল কাজটি করতে হবে উৎপাদন ও আমদানির পর্যায়ে। আমদানি বা উৎসে মানহীন পণ্য ঠেকাতে না পারলে দায় কেবল ভোক্তার ওপর চাপানো অন্যায্য।

একই সঙ্গে মানসম্মত হেলমেটকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে হবে। প্রয়োজন হলে নিরাপদ হেলমেট উৎপাদনে করসুবিধা দেওয়া এবং আমদানির শুল্ককাঠামো পর্যালোচনা করা যেতে পারে। চালক ও যাত্রীদেরও বুঝতে হবে হেলমেট পুলিশের মামলা এড়ানোর উপকরণ নয়, এটি জীবন রক্ষার আবশ্যিক সরঞ্জাম। জনসচেতনতা, নিয়মিত বাজার তদারকি এবং কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি একসঙ্গে নিশ্চিত করতে পারলেই মানহীন হেলমেটের বিপদ থেকে মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব।