সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

নির্বাচনী প্রচারপর্বে দেশ

উৎসবের পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব সবার

চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও প্রতীক বরাদ্দের মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটযুদ্ধ মূল পর্বে প্রবেশ করল। প্রার্থী ও দলগুলো আজ বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। দীর্ঘ অগণতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী শাসন এবং পরপর তিনটি অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পর চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তোলার যে বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে, সেই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনের সামনে একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিকল্প নেই।

আমরা মনে করি, উৎসবমুখর ও নিরাপদ ভোটের পরিবেশ সৃষ্টি করার দায়িত্ব যেমন নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারের, একই সঙ্গে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী রাজনৈতিক দলগুলোরও। নির্বাচনী মাঠে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য, গুজব ও ডিপফেকের মতো হুমকি প্রতিহত করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রচারণাপর্বে প্রার্থী, দল ও সমর্থকেরা কতটা ইতিবাচক প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে পারেন, তার ওপর ভোটার উপস্থিতি ও ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করবে বলে আমরা মনে করি।

সীমানা নির্ধারণজনিত জটিলতায় দুটি আসনে তফসিল পিছিয়ে যাওয়ায় ২৯৮টি আসনে প্রার্থীরা আজ থেকে প্রচারে নামছেন। স্বতন্ত্র ও দলীয় মিলিয়ে মোট প্রার্থী ১ হাজার ৯৬৭ জন। নিবন্ধন স্থগিত থাকায় আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। এ ছাড়া নিবন্ধিত ৬০টি দলের মধ্যে ৮টি দল কোনো প্রার্থী দেয়নি। বিভিন্ন জনমত জরিপের পূর্বাভাস বলছে, এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। বিএনপি কয়েকটি শরিক দলের সঙ্গে এবং জামায়াত ১০টি দলের সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।

নির্বাচনের মূল প্রচার শুরুর আগেই বেশ কিছু আসনে নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশের ক্ষেত্রে এ ধরনের সহিংসতা উদ্বেগজনক। এ ছাড়া কয়েকজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, তফসিল ঘোষণার পর, বিশেষ করে প্রচারণাপর্ব এবং নির্বাচন-পরবর্তী দিনগুলোতে সবচেয়ে বেশি সহিংসতা হয়। সহিংসতা ঠেকাতে নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর প্রস্তুতি, সতর্কতা ও সক্রিয়তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

সব প্রার্থী যাতে প্রচারের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পান, সেটা নিশ্চিত করাটা এই মুহূর্তে নির্বাচন কমিশনের গুরুদায়িত্ব। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কতটা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করছে, সেই পরীক্ষার পাস-ফেল এই পর্বেই নির্ধারণ হয়ে যাবে। বিগত সরকারের আমলে একতরফা, রাতের ভোট ও আমি-ডামির নির্বাচন করায় নাগরিকদের কাছে নির্বাচন কমিশনের যে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসার বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমরা আশা করি, নির্বাচনী সহিংসতা এবং প্রার্থীদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে নির্বাচন কমিশন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ও মনোযোগ দেবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে যে শঙ্কা ও উদ্বেগ আছে, অতি দ্রুত তার নিরসন হতে হবে। চোরাগোপ্তা হামলা, লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা প্রতিহতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এবারের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে সশস্ত্র বাহিনীসহ সব বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন থাকবেন। সে ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে কোনো অজুহাতই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালাতে হবে। ডিজিটাল মাধ্যমে গুজব ও অপতথ্য যাঁরা ছড়াবেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

চব্বিশের অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক পথে নিয়ে যাওয়ার যে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে তার বড় এক ধাপ অগ্রগতি। একটি শান্তিপূর্ণ, উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটাররা যাতে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সবাই মিলে সেই পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।