সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

পাহাড়ধসে মৃত্যুর মিছিল

ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে নাগরিকদের সরিয়ে নিন

বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর কারণে চট্টগ্রাম অঞ্চলে যে বড় ধরনের দুর্যোগ পরিস্থিতি তৈরি হতে যাচ্ছে, তার সতর্কতা আবহাওয়াবিদেরা আগে থেকেই করেছিলেন। তবে সেটাকে আমলে নিয়ে দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি যে নেওয়া হয়নি, একের পর এক পাহাড়ধসে মৃত্যুর মিছিলই তার বড় প্রমাণ দেয়। একই সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আমাদের সক্ষমতার ঘাটতিটাকে আরও একবার প্রকটভাবে সামনে নিয়ে এল।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের বরাতে প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, আষাঢ়ের শেষ দিকে চার দিন ধরে সারা দেশেই ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। তবে চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাঁচ দিন ধরে টানা যে ভারী ও অতি ভারী বৃষ্টি হচ্ছে, সেটা অস্বাভাবিক। গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামে রেকর্ড ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, যেটা ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টি। এমন রেকর্ড বৃষ্টির কারণে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার মানুষের জনজীবনে ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে এসেছে। বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে, চট্টগ্রাম নগরে টানা জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে, সড়ক ও রেলপথ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় অনেক জায়গায় যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, শাহ আমানত বিমানবন্দর দিয়ে ফ্লাইট ওঠানামার ক্ষেত্রেও ব্যাঘাত তৈরি হয়েছে, বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে আটকা পড়েছেন পর্যটকেরা।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে টানা ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ধসে প্রাণহানি ঘটেই চলেছে। গত চার দিনে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি ও বান্দরবানে পাহাড়ধসে অন্তত ২৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরে পৃথক তিনটি ঘটনায় শিশুসহ ১৩ জন নিহত হয়েছেন। চট্টগ্রামে পৃথক দুটি পাহাড়ধসের ঘটনায় দুই শিশু মারা গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বান্দরবানের লামায় পৃথক দুটি পাহাড়ধসের ঘটনায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন।

গত দুই দশকে বর্ষা মৌসুমে চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড়ধস বড় এক মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠেছে। আমাদের দেশের পাহাড়গুলো মূলত মাটির পাহাড়। একসময় প্রাকৃতিক পরিবেশে জন্ম নেওয়া ওই অঞ্চলের নিজস্ব গাছগুলো ভারী বৃষ্টি থেকে পাহাড় রক্ষায় প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হিসেবে দাঁড়াত। তবে গত কয়েক দশকে বিভিন্ন গোষ্ঠী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নির্বিচার পাহাড় কেটেছেন। অনেক জায়গায় পাহাড় কেটে সড়ক, রেল অবকাঠামোসহ নানা সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পও করা হয়েছে। এর সঙ্গে পাহাড়ের নিজস্ব পরিবেশে জন্ম নেওয়া গাছগুলো সাবাড় করে সেখানে নানা অর্থকরী ফলদ ও বনজ বাগান করা হয়েছে। এসব গাছের শিকড় খুব বেশি মাটি ধরে রাখতে পারছে না। এসব কারণে টানা বৃষ্টি হলেই পাহাড় ধসে মানুষের বসতিতে পড়ছে।

২০০৭ ও ২০১৭ সালে পাহাড়ধসে বড় বিপর্যয় ঘটার পর যে তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল, সেসব প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে পাহাড় কাটা বন্ধ, পুনর্বনায়ন, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে বসতি সরানো, পাহাড়ধসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানচিত্র তৈরি, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা উন্নত করা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বিতভাবে পাহাড় ব্যবস্থাপনার জন্য একটি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছিল। বাস্তবে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি। সেটা হয়নি বলেই এখন পর্যন্ত হাজার হাজার নাগরিককে চরম ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর সতর্ক করেছে, আরও দু-তিন দিন এ রকম ভারী বৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, প্রশাসন আগেভাগে ব্যবস্থা নিলে ও সক্রিয় হলে পাহাড়ধসে প্রাণহানি কমানো সম্ভব হয়। আমরা মনে করি, আরও বড় বিপর্যয়ের আগে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের বসতিগুলো থেকে নাগরিকদের সরিয়ে নিতে হবে।