কক্সবাজারের চকরিয়া রেলস্টেশনে সাম্প্রতিক সময়ে চুরি-ছিনতাই ও যাত্রীদের ওপর পাথর নিক্ষেপের ঘটনা যে মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে, তা কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা বিচ্ছিন্ন অপরাধপ্রবণতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। এটি স্পষ্টতই রাষ্ট্রীয় নজরদারির ঘাটতি, প্রশাসনিক দায়িত্বহীনতা এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক-অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতার সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ। সন্ধ্যা নামলেই যেখানে একটি রেলস্টেশন আতঙ্কের প্রতীক হয়ে ওঠে, সেখানে রাষ্ট্রের উপস্থিতি কেবল প্রশ্নবিদ্ধ নয়, কার্যত অনুপস্থিত।
গত দুই মাসে চকরিয়া রেলস্টেশনকে কেন্দ্র করে দুই ডজনের বেশি চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। যাত্রীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করা হয়েছে, নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী লুট হয়েছে, কেউ কেউ শারীরিক হামলার শিকারও হয়েছেন। এর পাশাপাশি চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের মতো প্রাণঘাতী ঘটনা ঘটছে নিয়মিত। অথচ এই স্টেশন কেবল একটি উপজেলার সীমিত পরিসরের অবকাঠামো নয়; পার্বত্য বান্দরবান থেকে উপকূলীয় মহেশখালী ও কুতুবদিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার।
এমন একটি স্থানে নিরাপত্তাহীনতা মানে, বৃহত্তর জনজীবনের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া। এই বাস্তবতায় অনিবার্য প্রশ্নটি হলো—রাষ্ট্র কোথায় এবং কারা তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ?
চকরিয়ার রেলস্টেশন এলাকায় রেলওয়ে পুলিশের কোনো স্থায়ী ফাঁড়ি নেই, নেই রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যকর উপস্থিতি। যে অ্যাপ্রোচ সড়কে অধিকাংশ ছিনতাই সংঘটিত হচ্ছে, সেখানে নেই পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, নেই কোনো প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি। স্থানীয় প্রশাসন, রেল কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে দায় এড়ানোর এক অস্বাস্থ্যকর সংস্কৃতি এখানে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। ‘চেষ্টা চলছে’—এই আত্মপক্ষ সমর্থন দিয়ে রাষ্ট্র তার সাংবিধানিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেতে পারে না।
দার্শনিক পরিভাষায় এটি সামাজিক চুক্তির ভাঙন। নাগরিক রাষ্ট্রকে আনুগত্য দেয় এই প্রত্যাশায় যে রাষ্ট্র তার জীবন ও চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। সেই মৌলিক প্রত্যাশা ভেঙে পড়লে সমাজে নৈরাজ্য জন্ম নেয়। চকরিয়া রেলস্টেশনের বর্তমান চিত্র সেই নৈরাজ্যের একটি ক্ষুদ্র অথচ গভীরভাবে উদ্বেগজনক প্রতীক।
এ অবস্থায় সমাধান কেবল অতিরিক্ত টহল বা সাময়িক অভিযানে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। অবিলম্বে চকরিয়ার তিনটি রেলস্টেশনে রেলওয়ে পুলিশের স্থায়ী ফাঁড়ি স্থাপন, অ্যাপ্রোচ সড়কে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা এবং সিসিটিভি–ভিত্তিক নজরদারি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের ন্যূনতম কর্তব্য। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন, রেল কর্তৃপক্ষ ও থানা–পুলিশের মধ্যে সুস্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক দায়িত্ব কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে, যাতে দায় এড়ানোর কোনো অবকাশ না থাকে।
দীর্ঘ মেয়াদে অপরাধ দমনের প্রকৃত পথ নিহিত রয়েছে সামাজিক পুনর্গঠনের মধ্যে—কর্মসংস্থান সৃষ্টি, তরুণ সমাজের দক্ষতা উন্নয়ন এবং আইনের শাসনের প্রতি নাগরিক আস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠায়। অপরাধীকে কেবল দমন করলেই চলবে না; অপরাধের সামাজিক উৎপত্তিকেও নির্মূল করতে হবে।