সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

পেকুয়ার করিয়ারদিয়া দ্বীপ

বাসিন্দাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করুন

নদী, খাল ও সাগরের বেষ্টনীতে আবদ্ধ কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার করিয়ারদিয়া দ্বীপটি কেবল একটি ভৌগোলিক বিচ্ছিন্ন জনপদ নয়; এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী অবহেলার এক করুণ প্রতীক। আড়াই হাজারের বেশি মানুষের বসবাস সত্ত্বেও এই দ্বীপে নেই ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা, নেই মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ, নেই নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা। নির্বাচন এলেও করিয়ারদিয়ায় পৌঁছায় না প্রার্থীদের পা, পৌঁছায় না উন্নয়নের কোনো প্রতিশ্রুতি।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের সঙ্গে প্রতিনিধিদের প্রত্যক্ষ সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। অথচ করিয়ারদিয়ার ক্ষেত্রে সেই সংযোগ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। প্রার্থীদের ব্যানার ঝুলে থাকলেও তাঁদের কেউ সরেজমিনে এসে মানুষের কথা শোনেননি। এটি নিছক অবহেলা নয়; এটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ভোটের হিসাব থেকে কার্যত বাদ দেওয়ার এক নির্মম বাস্তবতা। ভোটার হয়েও তাঁরা যেন নাগরিক নন—এ অনুভূতিই ক্রমে গভীর হচ্ছে দ্বীপবাসীর মধ্যে।

করিয়ারদিয়ার প্রধান সমস্যা যোগাযোগ। একটি সেতু নির্মিত হলে দ্বীপটির স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থনীতি ও প্রশাসনিক সেবার পথ উন্মুক্ত হবে। অথচ বছরের পর বছর ধরে এই মৌলিক দাবিটি উপেক্ষিত। সরকারি প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি এবং স্থানীয় প্রভাবশালী মহল—সবাই সমস্যার কথা জানেন, কিন্তু কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে অনীহা স্পষ্ট। এ অবহেলা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি সাংবিধানিক দায়িত্ব লঙ্ঘনের শামিল।

শিক্ষার ক্ষেত্রেও চিত্রটি শোচনীয়। একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়টি পরিত্যক্ত ঘোষিত ভবনে ঝুঁকি নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন অবহেলা একটি রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাজনক। স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা আরও ভয়াবহ—একটি প্যারাসিটামলের জন্যও নৌকায় চড়ে মূল ভূখণ্ডে যেতে হয়। দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় অঞ্চলে এটি কার্যত জীবনঝুঁকির সমান।

এই সংকটের দায় কেবল নির্বাচনী প্রার্থীদের নয়; স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, উন্নয়ন সংস্থা এবং রাজনৈতিক দল—কেউ এর দায় এড়াতে পারে না। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর উপস্থিতিও এখানে কার্যত অনুপস্থিত, যা তাদের ‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠী’ নিয়ে বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

করিয়ারদিয়ার সমস্যার সমাধান অসম্ভব নয়। প্রথমত, অবিলম্বে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, একটি পূর্ণাঙ্গ কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন জরুরি। তৃতীয়ত, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য নতুন ভবন নির্মাণ এবং পর্যায়ক্রমে মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি দ্বীপভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনাকে স্থানীয় সরকারব্যবস্থার আওতায় অগ্রাধিকার দিতে হবে।

এখনই যদি রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা করিয়ারদিয়ার দিকে দৃষ্টি না দেন, তবে তা কেবল একটি দ্বীপের নয়—সমগ্র গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নৈতিক দেউলিয়াত্বকেই উন্মোচিত করবে। অবহেলার এই অধ্যায় বন্ধ করে দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সময়ের অনিবার্য দাবি।