বন্য হাতির জন্য পাতা ফাঁদ

আনোয়ারায় কিশোরের মৃত্যুর দায় কার

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ধানখেতে বন্য হাতির আক্রমণ ঠেকাতে পাতা বৈদ্যুতিক ফাঁদে স্পৃষ্ট হয়ে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও চারজন। এ ঘটনা কেবল একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা নয়, এটি বন্য হাতির বিরুদ্ধে অমানবিকতার চরম ফল হিসেবেই আমাদের দেখা উচিত। বন্য প্রাণীর সঙ্গে মানুষের সংঘাত, প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই, স্থানীয় কর্তৃপক্ষসহ বন বিভাগের চরম ব্যর্থতা—সবকিছুই এ একটি ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

দেয়াঙ পাহাড়ের পাদদেশে ধানের খেতগুলোতে বন্য হাতি নেমে আসার ঘটনা নতুন নয়। দক্ষিণ চট্টগ্রামে ঘরবাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ ও সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে বনাঞ্চল, বিশেষ করে হাতির চারণভূমি ধ্বংস হওয়ার পথে। ফলে খাদ্যের অভাবে ও অবাধ বিচরণে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে হাতি এখন লোকালয়ে নেমে আসছে, ফসলের খেতে হানা দিচ্ছে। এদের ঠেকাতে বিদ্যুতের তার পেতে একধরনের মরণফাঁদ তৈরি করা হয়েছে, তা অবিশ্বাস্য। এটি শুধু অমানবিকই নয়, সুস্পষ্টভাবে ফৌজদারি অপরাধ।

জমির মালিকের দাবি, তিনি এ কাজের সঙ্গে জড়িত নন এবং দোষ অন্যের ওপর চাপাতে চাইছেন। কিন্তু তাঁর এ দায় এড়ানোর চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বন্য হাতির আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষা করার আইনসম্মত অনেক উপায় আছে, কিন্তু তা ব্যবহার না করে কেন এ ভয়ংকর পথ বেছে নেওয়া হলো?

এ ঘটনায় নিহত হয়েছে ১৭ বছরের কিশোর জাহেদুল ইসলাম। সে তার পরিবারের গরু আনতে গিয়েছিল, কিন্তু তার জীবন কেড়ে নিয়েছে মানুষের পাতা এক ফাঁদ। তার বাবা আবদুল হাফেজের আর্তনাদ, ‘চোখের সামনে ছেলেটা মারা গেল, আমি বাঁচাতে পারিনি।’ প্রশ্ন হলো, এ মর্মান্তিক ঘটনার দায় কে নেবে? কারা সেখানে বিদ্যুতের ফাঁদ পাতছে, তা অনুসন্ধান করে বের করা কঠিন কাজ নয়।

দক্ষিণ চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পেতে হাতি মারার ঘটনা নতুন নয়। আগেও সেসব ফাঁদে পড়ে মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। এমন ঘটনা রোধে ফাঁদ বসানোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ধরনের অবৈধ বৈদ্যুতিক ফাঁদ তৈরি বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেছেন, আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ আশ্বাস যেন শুধু আশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।

বন বিভাগের উচিত হবে হাতির বিচরণভূমিগুলো সংরক্ষণ করা এবং সেখানে হাতির খাদ্য উপযোগী গাছগাছালি লাগানো। দেয়াঙ পাহাড় ও তৎসংলগ্ন এলাকায় হাতির বিচরণ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে একধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের উচিত হবে বিষয়টি অধিক গুরুত্বের সঙ্গে দেখা এবং সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে এ ব্যাপারে যৌক্তিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।