সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ

সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি সচল করুন

সরকারি অর্থে অবকাঠামো নির্মাণের হিসাব আমাদের দেশে বেশ সহজ—প্রকল্প নেওয়া হয়, অনুমোদন হয়, বিপুল অর্থ ব্যয় করে ভবন তৈরি হয়, উদ্বোধন হয়। এরপর অনেক ক্ষেত্রেই আর খোঁজ থাকে না। ভবন থাকে, কিন্তু থাকে না তার ব্যবহার; প্রতিষ্ঠান থাকে, কিন্তু থাকে না তার কার্যক্রম। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের শৈলজারঞ্জন মজুমদার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র তারই একটি দৃষ্টান্ত।

রবীন্দ্রসংগীতের বিশিষ্ট সাধক, শিক্ষক ও স্বরলিপিকার শৈলজারঞ্জন মজুমদারের জন্মভিটায় প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে এই সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা, ভূমি অধিগ্রহণে ৫ কোটি এবং সংযোগ সড়কে প্রায় ১০ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের মার্চে এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। পরিকল্পনা ছিল রবীন্দ্রসংগীতের প্রশিক্ষণ ও গবেষণা, বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও হাওরাঞ্চলের লোকসংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা এবং নিয়মিত সাংস্কৃতিক আয়োজন।

কিন্তু গত দুই বছর সেখানে কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন হয়নি। সেখানকার ফটকে এখন তালা। দীর্ঘদিন পরিচর্যা না হওয়ায় ভেতরের হাঁটার পথ ও খোলা জায়গা আগাছায় ঢেকে গেছে। গ্রন্থাগার ও মহড়াকক্ষের ছাদের কিছু অংশ ভেঙে গেছে। লিফট অকেজো। ৫টি এসি অকার্যকর, অন্তত ৫৩টি বাতি নষ্ট। মিলনায়তনের অনেক সরঞ্জাম নেই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন সময়ে পাখা, চেয়ার-টেবিল, সিসিটিভি ক্যামেরা, সাউন্ড বক্স, কম্পিউটার, বাদ্যযন্ত্রসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম লুট হয়েছে।

আরও বিস্ময়কর হলো ৩৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র দুজন। ২১ সদস্যের পরিচালনা কমিটি থাকলেও গত তিন বছরে একটি সভাও হয়নি। কেন্দ্রটির নিজস্ব তহবিলে প্রায় এক কোটি টাকা আছে। অর্থাৎ অর্থের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি নয়, বরং ব্যবস্থাপনা ও সদিচ্ছার ঘাটতিই এখানে বড় সমস্যা। এ ঘটনা শুধু একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের দুরবস্থার গল্প নয়। এটি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের একটি পুরোনো অসুখের প্রতিচ্ছবি। প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের সময় বিপুল অর্থ ব্যয়ের উৎসাহ থাকে; কিন্তু প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সেটি কীভাবে চলবে, কত জনবল লাগবে, রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় কত, মানুষের কতটা কাজে আসবে—এসব প্রশ্ন যেন গৌণ হয়ে যায়। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো একসময় অনাথ হয়ে পড়ে। প্রকল্পের সাফল্য তখন তার সামাজিক ফলাফলে নয়, ব্যয়ের অঙ্কেই সীমাবদ্ধ থাকে। এই প্রবণতা বন্ধ হওয়া জরুরি।

মোহনগঞ্জের কেন্দ্রটি দ্রুত সংস্কার করে সচল করা দরকার। লুট ও নষ্ট হওয়া সরঞ্জামের পূর্ণাঙ্গ হিসাব, ভবনের মেরামত, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং পরিচালনা কমিটির সক্রিয়তা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় শিল্পী, সাংস্কৃতিক সংগঠন, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, গবেষণা, উৎসব ও সাংস্কৃতিক আয়োজন চালু করা যেতে পারে। ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি ভবন যদি তালাবদ্ধ থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—রাষ্ট্র কি উন্নয়ন করছে, নাকি শুধু উন্নয়নের স্থাপত্য বানাচ্ছে?