অন্যের সন্তান লালন–পালনের ক্ষেত্রে অন্য অনেক দেশে সুস্পষ্ট আইনি ব্যবস্থা থাকলেও বাংলাদেশে সবার জন্য প্রযোজ্য কোনো সাধারণ (সিভিল) দত্তক আইন নেই। এই শূন্যতাকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে রীতিমতো দর–কষাকষি করে অর্ডার দিয়ে শিশু কেনাবেচার আলাপ চলছে। এটি একদিকে যেমন প্রতারণার জাল বিস্তার করছে, অন্যদিকে শিশু পাচারের ক্ষেত্রও তৈরি করছে।
প্রথম আলোর সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দত্তকের নামে শিশু কেনাবেচার যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে উদ্বিগ্ন না হওয়ার কোনো কারণ নেই। প্রতিবেদনে ফেসবুকে এ ধরনের ৩৯টি প্রকাশ্য গ্রুপের সন্ধান পাওয়া গেছে এবং ২৮৮টি পোস্ট পর্যালোচনা করা হয়েছে। বেশির ভাগ গ্রুপের সদস্যসংখ্যা কয়েক শ, আবার ২০ হাজার সদস্যের গ্রুপও আছে। এসব তথ্য থেকে এটা স্পষ্ট যে নিঃসন্তান দম্পতিদের সন্তান লালন–পালনের আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করে দেশে বড় বাণিজ্যিক চক্র গড়ে উঠেছে।
শিশু কেনাবেচার এই চক্র শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই সীমাবদ্ধ নয়। এক নারী দালাল জানিয়েছেন, তিনি ও তাঁর সহযোগীরা বিভিন্ন হাসপাতালে এমন অন্তঃসত্ত্বা নারীদের খুঁজে বের করেন, যাঁরা সন্তান রাখতে চান না। পরে একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সন্তান জন্মের আগপর্যন্ত তাঁদের দেখভালের ব্যবস্থা করা হয়।
সন্তান বিক্রি করা প্রত্যেকেই যে পেশাদার দালাল, এমনটা নয়। কিছু ক্ষেত্রে শিশুর ভরণপোষণের সমর্থ, এমন অভিভাবকেরাও এর সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রতারণার ঘটনাও ঘটছে। উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, এ ধরনের প্রতারণা ও অনিয়ম ঠেকাতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর তৎপরতা এখনো দৃশ্যমান নয়। বাংলাদেশ দণ্ডবিধিতে অনৈতিক বা অবৈধ উদ্দেশ্যে শিশু বিক্রি বা কেনার শাস্তির বিধান রয়েছে। মানব পাচারবিষয়ক নতুন আইনেও অসৎ উদ্দেশ্যে দত্তক নেওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। অথচ পুলিশ বলছে, শিশু কেনাবেচার বিষয়ে তারা নির্দিষ্ট অভিযোগ পায়নি। বাস্তবতা হলো, ক্রেতা ও বিক্রেতা দুজনই যখন সম্মত থাকেন, তখন অভিযোগ করারও কেউ থাকে না। ফলে এসব শিশু শেষ পর্যন্ত কোথায় যাচ্ছে, তাদের কী কাজে জড়ানো হচ্ছে, তার কোনো নজরদারি থাকছে না।
আমরা মনে করি, শিশু কেনাবেচা ঘিরে যে ডিজিটাল প্রতারণা চলছে, ফেসবুকের মালিক প্রতিষ্ঠান মেটার সেই দায় রয়েছে। শিশু বিক্রি বা অবৈধ দত্তক নেওয়ার সুযোগ করে দেয়—এমন আধেয় মেটার নিজস্ব নীতিমালার পরিপন্থী। অথচ প্রতিবেদনে যে গ্রুপগুলোর সন্ধান পাওয়া গেছে, সেগুলো সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়। বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর উচিত মেটাকে এসব গ্রুপ সরিয়ে নিতে বলা।
আমরা মনে করি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে অনলাইনে শিশু কেনাবেচার মতো আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এই অবৈধ বাণিজ্য বন্ধে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
আমরা মনে করি, বাংলাদেশে সব ধর্মের মানুষের জন্য শিশু দত্তকের একটি সাধারণ (সিভিল) আইনি কাঠামো চালুর বিষয়টি সরকারকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত। এ ব্যবস্থায় আদালতের যথাযথ তদারকি, দত্তক গ্রহীতাদের যাচাই-বাছাই এবং প্রতিটি শিশুর তথ্য সংরক্ষণের জন্য একটি জাতীয় নিবন্ধনব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। সন্তানহীন অনেক দম্পতিই একটি সন্তানের স্বপ্ন দেখেন। অন্যদিকে অনেক এতিম ও অসহায় শিশুর জীবন দুর্ভোগ আর অনিশ্চয়তায় কাটে। ফলে শিশু দত্তকের নিরাপদ ও বৈধ পথ তৈরি করা জরুরি। উপযুক্ত ও পর্যাপ্ত আইন এবং নজরদারির ব্যবস্থা থাকলেই কেবল শিশু বেচাকেনার এই অবৈধ ব্যবসা কমিয়ে আনা সম্ভব।