সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

ঢাকার যানজট

শুধু নির্দেশনা নয়, বাস্তবায়ন জরুরি

ঢাকা বাসযোগ্যতার দিক থেকে বিশ্বের তলানিতে থাকা শহরগুলোর একটি। এর একটি বড় কারণ এই শহরের পরিবহনব্যবস্থার চরম নৈরাজ্য ও দুর্বিষহ যানজট। ঢাকার একই সড়কে রিকশা, ঠেলাগাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি, ছোট, বড়, হালকা, ভারী ও দ্রুতগতির যানসহ ১৮ ধরনের যানবাহন চলে। এর ফলে ঢাকার সড়কে কর্মব্যস্ত সময়ে গাড়ির গড় গতি হাঁটার গতিতে নেমে এসেছে। লক্কড়ঝক্কড় ও ফিটনেসবিহীন বাসের রেষারেষি আর পাল্লাপাল্লি সড়ককে শুধু বিশৃঙ্খল করছে না, নাগরিকেরা প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হয়ে তার মূল্যও চুকাচ্ছেন। ফলে বছরের পর বছর ধরে ঢাকার সড়ক নাগরিকদের দুর্বিষহ ভোগান্তি ও দীর্ঘশ্বাসের কারণ হয়ে রয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর যানজট নিরসন, ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে যে সাতটি নির্দেশনা দিয়েছেন, সেটি ইতিবাচক বলেই আমরা মনে করি। তবে অতীত অভিজ্ঞতার শিক্ষা হচ্ছে, পরিবহন খাত ঘিরে মালিক, পরিবহননেতা, ক্ষমতাসীন দলের সুবিধাভোগী অংশ এবং তদারকি সংস্থা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে সব সময়ই শক্তিশালী একটি ‘নেক্সাস’ গড়ে ওঠে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশনাও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে লোকদেখানো কিছু পদক্ষেপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। এ ক্ষেত্রেও যেন তার পুনরাবৃত্তি না হয়, সে জন্য শুরু থেকেই নির্দেশনা বাস্তবায়নে কঠোর তদারকি ও সমন্বয় প্রয়োজন।

সংবাদ সংস্থা বাসসের বরাতে প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেট গাবতলীতে সরিয়ে নেওয়া, ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল সরিয়ে কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর, এক্সপ্রেসওয়ে ও উড়ালসড়কের টোল প্লাজাগুলোতে ইটিসি সিস্টেম চালু, অনুমোদনহীন ডাবল ডেকার স্লিপার বাস চলাচলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেন। এ ছাড়া ঢাকার অটোরিকশা চলাচলকে আরও সুশৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রিত করতে একটি পৃথক নীতিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ঢাকার যানজট কমাতে ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে শহরের ভেতর থেকে বাস টার্মিনালগুলো সরানোর সুপারিশ পরিবহনবিশেষজ্ঞরা অনেক বছর ধরেই দিয়ে এসেছেন। কারওয়ান বাজার থেকে কাঁচাবাজার সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নানা সময়ে আলোচিত হয়েছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্বার্থে এসব পরিকল্পনা কখনোই আলোর মুখ দেখেনি। ফলে নির্দেশনা বাস্তবায়নই এখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অবাধে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচলের সুযোগ করে দেওয়ায় ঢাকার বিশৃঙ্খল সড়ক আরও বেশি বিশৃঙ্খল হয়েছে। একটি বড় জনগোষ্ঠী জীবিকার জন্য অটোরিকশার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় এ বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সম্ভব নয়; কিন্তু মূল সড়কে অটোরিকশা চলাচল বন্ধ না করা হলে সড়কে যতই স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থা চালু করা হোক না কেন, তাতে অবস্থার খুব বেশি পরিবর্তন আসবে না। ফলে গ্রাম-মফস্‌সলে কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি অটোরিকশাকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যে শহরে মেট্রোরেলের মতো আধুনিক প্রযুক্তির গণপরিবহনব্যবস্থা চালু হয়েছে, সেই শহরের সড়কজুড়ে লক্কড়ঝক্কড় বাস দাপিয়ে চলে কী করে? পুরো বিশ্বে গণপরিবহন যেখানে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজির মাধ্যমে পরিচালিত হয়, সেখানে উদ্যোগ নেওয়ার পরও আমরা সেটি বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছি। এর কারণ হচ্ছে, পুরোনো ও আনফিট বাস দিয়ে এটি চালু করতে গিয়ে পরীক্ষিত মডেলটি আমরা নষ্ট করেছি। বাসকেন্দ্রিক একটি আধুনিক ও সুশৃঙ্খল গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা ছাড়া ঢাকার যানজট নিরসনে কোনো উদ্যোগই ফলপ্রসূ হতে পারে না।