এমপিওভুক্ত বেসরকারি স্কুল–কলেজে কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতা আবারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের হাতে ফেরানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ সিদ্ধান্ত শিক্ষা খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির নীতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট পিছু হটা। কেননা, এটি একদিকে যেমন নিয়োগ–বাণিজ্য, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিকে উৎসাহিত করবে, অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব বাড়বে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের বিষয়টি পরিচালনা পর্ষদের কাজ নয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের বরাতে প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতা জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির কাছ থেকে সরিয়ে আবারও পরিচালনা পর্ষদের হাতে দেওয়া হচ্ছে। এ সিদ্ধান্তের ফলে এখন থেকে ট্রেড সহকারী, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর, অফিস সহকারী কাম হিসাব সহকারী, কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর, গবেষণা বা ল্যাব সহকারী, নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নৈশপ্রহরী, আয়া ও অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ দিতে পারবে স্কুল ও কলেজের পরিচালনা পর্ষদ। এর মধ্যে কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর, গবেষণা বা ল্যাব সহকারী এ রকম পদগুলো সরাসরি শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে ঘুষ–বাণিজ্য, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ অনেক পুরোনো ও বিস্তৃত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একসময় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ছিল পরিচালনা পর্ষদের হাতে। এর ফলাফল যে আমাদের শিক্ষা খাতের জন্য মোটেই সুখকর হয়নি, শিক্ষা নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন সংস্থার সাম্প্রতিক জরিপই তার সাক্ষ্য দেয়। এটা সত্যি যে আমাদের শিক্ষা খাতে অবকাঠামো ও শিক্ষকসংকট আছে; কিন্তু এসব ছাপিয়ে শিক্ষার মানের প্রশ্নটিই সবচেয়ে বড় করে সামনে আসে। আমাদের শিক্ষার্থীরা গণিত, ইংরেজি, বিজ্ঞানের মতো বিষয়ে ব্যাপক শিখনঘাটতি ও দুর্বলতা নিয়ে ওপরের শ্রেণিতে উঠছে। এর ফল হচ্ছে সুদূরপ্রসারী। কেননা, উচ্চশিক্ষা শেষ করার পরও বিপুলসংখ্যক তরুণ বেকার থেকে যাচ্ছেন।
মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে ভালো শিক্ষক নিয়োগের বিকল্প নেই। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) সুপারিশের ভিত্তিতে হওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বেসরকারি স্কুল ও কলেজগুলো অপেক্ষাকৃত ভালো শিক্ষক পেয়েছে। তবে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক এবং কর্মচারী পদে নিয়োগ পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে হওয়ায় এসব নিয়োগে আর্থিক লেনদেন, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির ঘটনা ঘটত।
এ প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ এনটিআরসিএ এবং কর্মচারী নিয়োগ জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে কমিটির কাছে দেওয়া হয়েছিল। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব স্তরে শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের এ প্রক্রিয়া শিক্ষার মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত ইতিবাচক ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে এক ধাপ অগ্রগতি বলেই আমরা মনে করি। এ থেকে কর্মচারী নিয়োগে আবার পুরোনো ব্যবস্থায় ফেরার অর্থ হলো নিশ্চিত পিছু হটা।
বাস্তবতা হচ্ছে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরাই যুক্ত থাকেন। কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতা তাঁদের হাতে ফেরার অর্থ হচ্ছে আবারও দুর্নীতির সুযোগকে খুলে দেওয়া। পরিচালনা পর্ষদের কাজ শিক্ষার মান নিশ্চিত করা। কেনাকাটা, অবকাঠামো উন্নয়ন কিংবা শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব তাদের নয়।
আমরা মনে করি, শিক্ষার মানের প্রশ্নে সরকার কোনোভাবেই আপস করতে পারে না।