বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন

প্রয়োজন দ্রুত ও টেকসই পদক্ষেপ

টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি জেলায় যে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে তার ক্ষতচিহ্নগুলো ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে এখন শুধু ধ্বংসের ছবি। পানি নেমে গেলেও হাজার হাজার মানুষ এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে দিন কাটাচ্ছেন। ঘরবাড়ি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হওয়া এই বিপুল জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত এখন রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বন্যায় সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থা, কৃষি এবং মৎস্য খাতের ওপর। শুধু কক্সবাজার জেলাতেই আনুমানিক ৮৯০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে, যেখানে দুই হাজার কিলোমিটারের বেশি সড়ক এবং ৭৯টি সেতু-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বান্দরবান ও রাঙামাটির পাহাড়ি অঞ্চলেও শত শত কিলোমিটার সড়ক ভেঙে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। যোগাযোগব্যবস্থার এই বিপর্যয় বন্যা-পরবর্তী ত্রাণ বিতরণ ও সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। প্রশাসনকে অবিলম্বে জরুরি ভিত্তিতে রাস্তাঘাট ও সেতু মেরামত করতে হবে, যাতে গ্রামীণ অর্থনীতি পুরোপুরি থমকে না যায়।

তবে অবকাঠামোর চেয়েও দীর্ঘমেয়াদি ও স্পর্শকাতর সংকট তৈরি হয়েছে কৃষি ও মৎস্য খাতে। কক্সবাজার, লোহাগাড়া, রাঙামাটি ও বান্দরবানে হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি এবং মাছের ঘের ঢলের পানিতে ভেসে গেছে। মাঠের পর মাঠ নষ্ট হওয়া ফসল দেখে কৃষকেরা আজ দিশেহারা। লাখ লাখ টাকার মাছ ভেসে যাওয়ায় খামারিরা ঋণের আশঙ্কায় নিমজ্জিত। গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড এই কৃষক ও খামারিদের যদি এখন বিশেষ প্রণোদনা, বিনা সুদে ঋণ এবং বিনা মূল্যে বীজ ও সার না দেওয়া হয়, তবে বাজারে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য আরও প্রকট হবে।

সরকার ইতিমধ্যে ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ এবং আন্তমন্ত্রণালয় সভার মাধ্যমে তৎপরতা শুরু করেছে, যা ইতিবাচক। তবে কেবল চাল বা শুকনো খাবার বিতরণের সাময়িক জোড়াতালি দিয়ে এই বিশাল ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। এখন প্রয়োজন একটি সমন্বিত, দ্রুত ও টেকসই পুনর্বাসন পরিকল্পনা। পাহাড়ধস রোধে বনায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনকে মাথায় রেখে টেকসই সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে। দুর্গত এলাকার মানুষ যাতে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সে জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা ও ব্যাংকগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। বন্যায় ৫৪টি অমূল্য প্রাণের অকালপ্রয়াণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতি ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে আরও কতটা সংবেদনশীল ও গতিশীল করা প্রয়োজন।