মানুষ হাসপাতালে যায় চিকিৎসা নিতে, রোগমুক্তি লাভ করতে। কিন্তু খুলনায় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের ক্ষেত্রে বিষয়টি উল্টো। সেখানে মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে যেতে ভয় পায়। কারণ, কখন ভবনের দেয়াল ধসে পড়ে বা ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে, সেই আতঙ্কে থাকতে হয় রোগীদের।
যেখানে অন্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীদের ভিড়ে পা রাখার জায়গা পাওয়া যায় না, সেখানে এ হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা দিন দিন কমছে। অন্যদিকে আমরা জানতে পারছি, যক্ষ্মা নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রায় দেশ পিছিয়ে পড়ছে। তখন খুলনা অঞ্চলের যক্ষ্মারোগীদের সবচেয়ে পুরোনো এ চিকিৎসাকেন্দ্রের এ হাল নিয়ে আমাদের শঙ্কিত হতেই হয়।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ১৯৬৫ সালে খুলনা নগরের খানজাহান আলী থানায় সাত একর জায়গার ওপর খুলনা বক্ষব্যাধি হাসপাতাল নির্মিত হয়। পদ্মার এপারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার যক্ষ্মারোগীদের ভরসাস্থল এই হাসপাতাল। দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে হাসপাতালটির ভবনের দেয়ালে ফাটল ধরেছে। ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে লোহার রড বের হয়ে আছে। শৌচাগারগুলোও ব্যবহারের অনুপযোগী। বৃষ্টি হলে তো সেখানে আরও বেশি দুর্ভোগ তৈরি হয়। রোগীরা ছাড়াও হাসপাতালের দুরবস্থা নিয়ে আতঙ্কে থাকেন চিকিৎসক-নার্সরাও।
এমন পরিস্থিতিতে রোগীরা হাসপাতালটিতে আসা কমিয়ে দিয়েছেন। ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে দিনে ৪০ জনের কম রোগী ভর্তি হন এখন। যদিও সরকারি হাসপাতালে শয্যার কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকে। অথচ দশকের পর দশক ধরে যক্ষ্মা প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রেখে এসেছে এ হাসপাতাল।
জনবলসংকট দিয়েও বোঝা যায় এই ঐতিহ্যবাহী হাসপাতালটি নিয়ে অবহেলা চরমে। এই হাসপাতালে চিকিৎসকের ১১টি পদের মধ্যে বিশেষজ্ঞের দুটিসহ পাঁচটিই শূন্য। পদ থাকলেও হাসপাতালে প্যাথলজি ও রেডিওলজির কোনো চিকিৎসক নেই।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় দুই বছর ধরে অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে। নার্স ছাড়া অন্য সব পদেও রয়েছে জনবলসংকট। চিকিৎসক, নার্স, কর্মচারীদের জন্য পাঁচটি আবাসিক ভবন থাকলেও সেগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী। সব মিলিয়ে মাত্র তিনটি পরিবার সেখানে বাস করে।
হাসপাতালটির আধুনিকায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। এ সময় যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু এ হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ কোনো বহির্বিভাগ পর্যন্ত নেই। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে বহির্বিভাগে রোগী দেখা হয়, তবে সব সময় ওষুধ দেওয়া হয় না। তাহলে যক্ষ্মারোগীরা কেন হাসপাতালটিতে আসবেন?
একটা সময় যক্ষ্মা নির্মূলে সফলতা নিয়ে আমরা বেশ প্রশংসিত হয়েছিলাম। সেই অর্জন ধরে রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর আন্তরিকতায় কোনো ঘাটতি রাখা যাবে না। এর জন্য এ রোগের চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর প্রতি আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে। আমরা মনে করি, খুলনা বক্ষব্যাধি হাসপাতালকে ঢেলে সাজাতে অতিসত্বর কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।