রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে লিফট নিয়ে আবারও ভয়াবহ জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। বারবার একই হাসপাতালে একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় প্রতীয়মান হয় যে এখানে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে, যারা সব সরকারের সময়ই জোরালোভাবে সক্রিয়। এটি কেবল আর্থিক অনিয়ম বা দুর্নীতির বিষয় নয়, মুমূর্ষু রোগীর জীবন নিয়ে এক নির্লজ্জ তামাশা। যেভাবেই হোক, এই অনিয়ম বন্ধ করতেই হবে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইসিইউর পাঁচতলা ভবনে রোগী ওঠানামার জন্য ১ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে জাপানি ‘ফুজিটেক’ কোম্পানির লিফট দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এক ভয়াবহ প্রতারণার গল্প বেরিয়ে এসেছে। লিফটটির কোনো বৈধ উৎস নেই; বিভিন্ন প্যাকেজের যন্ত্রাংশ একত্র করে এটি সরবরাহ করা হয়েছে। এমনকি জালিয়াতি ঢাকতে ভুয়া ই-মেইল আইডি ও ডোমেইন ব্যবহার করে কাগজপত্র তৈরি করা হয়েছে। সবচেয়ে রহস্যজনক বিষয় হলো, বন্দরের ‘পোর্ট ইন্সপেকশন’ এড়াতে তড়িঘড়ি করে রাতের অন্ধকারে মালামাল সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তার মানে হাসপাতাল থেকে বন্দর পর্যন্ত একটি সুগঠিত চক্র এখানে কাজ করছে।
দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এই দুর্নীতির মাশুল দিচ্ছেন সাধারণ রোগীরা। ২০২৪ সালের শুরুতে আইসিইউ ভবন প্রস্তুত হলেও লিফট জটিলতায় দীর্ঘ দুই বছর ধরে রোগীরা এর সুফল পাচ্ছেন না। পাঁচতলায় মুমূর্ষু রোগীদের সিঁড়ি দিয়ে বা বিকল্প উপায়ে ওঠানো-নামানো যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ ও অমানবিক, তা ভুক্তভোগী পরিবার ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। জনগুরুত্বপূর্ণ একটি বিভাগে এমন স্থবিরতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
এখানে গণপূর্ত বিভাগের ভূমিকা চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। হাসপাতালের তদন্ত কমিটি যখন তথ্য-প্রমাণসহ জালিয়াতি ধরিয়ে দিচ্ছে, তখন গণপূর্ত বিভাগ নিজস্ব ‘কারিগরি কমিটির’ মাধ্যমে লিফটটিকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে। হাসপাতালের প্রতিনিধি ছাড়াই করা সেই তদন্ত রিপোর্ট স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহের উদ্রেক করে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও গণপূর্তের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ ছাড়া এমন দুঃসাহসিক জালিয়াতি সম্ভব নয় বলেই সচেতন মহল মনে করে।
তদন্ত কমিটি যেখানে জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছে এবং দোষীদের শাস্তির সুপারিশ করেছে, সেখানে কেন এখনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের দাবি, অবিলম্বে এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ব্রাদার্স কনস্ট্রাকশন’ এবং গণপূর্ত বিভাগের দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে কালক্ষেপণ না করে একটি মানসম্মত লিফট স্থাপনের মাধ্যমে আইসিইউ ইউনিটটি দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে সচল করতে হবে। মুমূর্ষু রোগীদের সঙ্গে এই অমানবিক আচরণ বন্ধ করতেই হবে।