খাগড়াছড়ির দুর্গম অঞ্চল

ভোটাররা যেন কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেন

খাগড়াছড়ির পাহাড়ি জনপদে ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে উঠেছে দূরত্ব, খরচ আর ঝুঁকির কঠিন সমীকরণ। প্রথম আলোর খবরে এসেছে, খাগড়াছড়ির প্রত্যন্ত এলাকাগুলোয় অনেক ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে যেতে পাঁচ থেকে ছয় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এই দূরত্ব পাড়ি দিতে বেশ কয়েক ঘণ্টা লেগে যায়।

যানবাহন ঠিক করে ভোটকেন্দ্রে যেতে যে ভাড়া লাগে, তা-ও দেওয়ার সামর্থ্য নেই বেশির ভাগ ভোটারের। এ অবস্থায় অনেকেই ভোট দিতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ সিদ্ধান্ত কোনো রাজনৈতিক উদাসীনতা থেকে নয়; বরং জীবনযাপনের বাস্তবতা থেকে জন্ম নিয়েছে।

খাগড়াছড়ির দুর্গম পাহাড়ি ও সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয় ভোটকেন্দ্রের দূরত্ব দীর্ঘদিনের সমস্যা। পাহাড়ে মানুষ ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকে। একই কেন্দ্রে অনেক ওয়ার্ড ও পাড়ার ভোটারকে ভোট দিতে হয়। বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, অসুস্থ কিংবা গর্ভবতী নারীদের জন্য এই পথ পাড়ি দেওয়া প্রায় অসম্ভব। অনেককে ভোটের আগের দিনই আত্মীয়ের বাড়িতে এসে থাকতে হয়। তাতেও সবাই পারেন না। ফলে ভোটাধিকার থাকলেও ভোট দেওয়ার সুযোগ সবার জন্য সমান নয়।

নির্বাচন কমিশনের তালিকা অনুযায়ী খাগড়াছড়ি সংসদীয় আসনের অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কেন্দ্র অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। এসব কেন্দ্রে বিপুলসংখ্যক ভোটার থাকলেও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ ভোটারদের অনীহা বাড়াচ্ছে। এখানে আছে দুর্গম পথ, যোগাযোগের সংকট আর মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সংগ্রাম। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে সমতলের মতো কেন্দ্র নির্ধারণ করা হলে ভোটার অংশগ্রহণ বাড়বে না; বরং আরও কমবে।

ভোটার অংশগ্রহণ গণতন্ত্র ও নির্বাচনের প্রাণ। কিন্তু অংশগ্রহণ তখনই অর্থবহ হয়, যখন ভোট দিতে যাওয়াটা মানুষের জন্য সহজ ও নিরাপদ হয়। খাগড়াছড়ির মতো এলাকায় ভোটকেন্দ্র নির্ধারণের সময় শুধু প্রশাসনিক সুবিধা নয়, মানুষের জীবনযাত্রা, ভূগোল ও সামাজিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রথাগত নেতৃত্ব ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে আগাম আলোচনা ছাড়া কেন্দ্রবিন্যাস করলে সে সিদ্ধান্ত মাঠের বাস্তবতায় টেকে না।

নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শান্তিপূর্ণ ভোটের আশ্বাস দিচ্ছে। তা অবশ্যই প্রয়োজনীয়। তবে ভোটার যেন কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেন, খরচের ভয়ে ঘরে বসে না থাকেন, সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

প্রয়োজনে নতুন কেন্দ্র স্থাপন, অস্থায়ী কেন্দ্র, যাতায়াতে সহায়তা বা বিশেষ ব্যবস্থার কথা ভাবতে হবে। ভোটাধিকার যেন পাহাড়ি মানুষের কাছে বোঝা না হয়ে ওঠে, সেটিই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারকদের মূল লক্ষ্য। তা না হলে ভোটের দিন কেন্দ্র থাকবে, ব্যালট থাকবে, কিন্তু ভোটার থাকবে না।