সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

অবৈধ অভিবাসনে মৃত্যু

সরকারকে নিতে হবে কঠোর অবস্থান

অবৈধ অভিবাসনের নির্মম বাস্তবতা আবারও আমাদের সামনে এক তরুণের নিথর দেহ নিয়ে হাজির হয়েছে। প্রথম আলোর খবরে এসেছে, চট্টগ্রামের চন্দনাইশের এক তরুণ, যাঁর বয়স মাত্র ১৮, স্বপ্ন দেখেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে নিজের ও পরিবারের ভাগ্য বদলাবেন। পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে ৯ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তাঁকে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেই স্বপ্নের যাত্রা শেষ হয়েছে অচেনা ভূমিতে মৃত্যু দিয়ে।

গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা দালাল চক্র দীর্ঘদিন ধরে উন্নত জীবনের মায়া দেখিয়ে তরুণদের বিপজ্জনক পথে ঠেলে দিচ্ছে। তারা বিদেশে সাফল্যের গল্প শোনায়, আত্মীয়স্বজনের আর্থিক উন্নতির উদাহরণ তুলে ধরে, দ্রুত আয় ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দেয়। বাস্তবে তাদের পরিকল্পনা থাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। 

বৈধ ভিসা ও নিরাপদ যাত্রার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু হলেও মাঝপথে বদলে যায় রুট। জঙ্গল, সীমান্ত, অনাহার, অসুস্থতা এবং নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে চলতে হয় দীর্ঘ পথ। অনেক ক্ষেত্রে লিবিয়া বা অন্য দেশে আটকে রেখে নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে পরিবার থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হয়। এই নিষ্ঠুর ব্যবসার কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের অসহায় স্বপ্ন। 

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে যাওয়া অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই সর্বাধিক। ২০২৩ সালেও একই চিত্র দেখা গেছে। গত এক দশকে ভূমধ্যসাগরে ডুবে ২৫ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যাঁদের মধ্যে প্রতিবছর অন্তত ৫০০ জনই ছিল বাংলাদেশি। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়; একটি পরিবার, একটি সম্ভাবনা, একটি জীবনের ধ্বংসের চিত্র। 

প্রশ্ন হলো কেন এত তরুণ জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছেন? এর পেছনে রয়েছে বেকারত্ব, দক্ষতার অভাব, আয়ের সীমাবদ্ধতা এবং বিদেশে সাফল্যের অতিরঞ্জিত বয়ান। স্থানীয় দালালেরা সামাজিক সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে বিশ্বাস অর্জন করে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারও প্রবাসী আত্মীয়ের সাফল্য দেখে একই পথকে গ্রহণযোগ্য মনে করে। ফলে ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা থাকলেও তা বাস্তব সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে না। 

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রথমত মানব পাচার চক্রের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। গ্রামপর্যায়ে দালালদের নেটওয়ার্ক ভাঙতে গোয়েন্দা নজরদারি ও দ্রুত বিচার প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের পথ সহজ করতে হবে। প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্বচ্ছ রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা গেলে অবৈধ পথের আকর্ষণ কমবে। তৃতীয়ত, গণসচেতনতা বাড়াতে স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। 

রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল মৃতদেহ ফিরিয়ে আনা নয়, এমন মৃত্যু প্রতিরোধ করা। বিদেশে যাওয়ার যে পথ প্রতারণার ফাঁদে পড়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়, সে পথ বন্ধে আমাদের সম্মিলিত পদক্ষেপ এখনই জরুরি।