সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

খরতাপে পুড়ছে শ্রমজীবন

ঢাকার রিকশাচালকদের সুরক্ষা কোথায়

‘গরম আর সহ্য হয় না’ বলে ঢাকার এক রিকশাচালকের আকুতির মধ্যে তাঁদের কর্মপরিবেশের যে বাস্তবতা লুকিয়ে আছে, তা সম্প্রতি এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে। ঢাকার রিকশাচালকেরা যে মাত্রার তাপে কাজ করছেন, তা একদিকে তাঁদের শারীরিক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন এই ঝুঁকি বৃদ্ধির আশঙ্কাও তৈরি করছে বলে গবেষকেরা বলেছেন। কিন্তু রিকশাচালকদের এই ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমজীবন নিয়ে আমাদের নীতিনির্ধারকদের ভাবনা কী?

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া সান ডিয়েগো, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা একটি গবেষণায় দেখিয়েছেন, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তাঁদের গবেষণায় অংশ নেওয়া রিকশাচালকদের ৩২ শতাংশ ইতিমধ্যে উচ্চ তাপঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন। ২০২৬-৩০-এর মধ্যে উচ্চ তাপঝুঁকিতে থাকা রিকশাচালকের হার বেড়ে ৩৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধির সঙ্গে রিকশাচালকদের শরীরের তাপমাত্রা, হৃদ্‌যন্ত্রের চাপ এবং ঘামের মাত্রাও বৃদ্ধি পায়। বয়স্ক রিকশাচালকদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক চাপ বেশি দেখা গেছে। পেশাগত স্বাস্থ্যঝুঁকির স্পষ্ট সংকেত দেখা যাচ্ছে বলে গবেষকেরা মনে করছেন।

ঢাকা শহরে আনুমানিক ১১ লাখ রিকশা থাকলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের নগর-পরিকল্পনায় এই বিপুলসংখ্যক অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের সুরক্ষার বিষয়টি বরাবরই উপেক্ষিত। গবেষণায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী চালকদের গড় বয়স ৪৮ এবং তাঁরা দিনে প্রায় ১০ ঘণ্টা হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে রিকশাচালকদের কাছে থেকে রেজিস্ট্রেশন ফি নেওয়া হলেও প্রচণ্ড গরমে পিপাসা মেটানোর জন্য একটু বিশুদ্ধ পানি, শরীর জুড়ানোর মতো ছায়াবৃত স্থান কিংবা ন্যূনতম শৌচাগারের ব্যবস্থা করা হয় না।

শ্রমজীবী মানুষের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের নানামুখী প্রভাব সর্বজনবিদিত। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) অতিরিক্ত তাপের কারণে বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ১৮ হাজার ৯৭০ জন শ্রমজীবী মানুষের মৃত্যুর কথা তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অ্যাড্রিয়েন আরশট-রকফেলার ফাউন্ডেশন রেজিলিয়েন্স সেন্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তাপপ্রবাহের প্রভাব সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক উৎপাদনেও পড়ে। বিশ্বের অন্যান্য বড় শহরের তুলনায় ঢাকা শহরের অর্থনৈতিক ক্ষতি বেশি হয় বলে জানানো হয়েছিল। খোলা রাস্তায়, সরাসরি রোদ ও যানজটের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে কায়িক শ্রম করেন, এই রিকশাচালকেরাই তাপঝুঁকির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের মধ্যেই থাকবেন।   

অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং পরিবেশবিষয়ক ভাবনাহীন উন্নয়ন পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলছে। যেমন সম্প্রতি ‘ইমপ্যাক্ট অব এলিভেটেড ট্রান্সপোর্টেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার অন আরবান থার্মাল এনভায়রনমেন্ট ইন ঢাকা মেগাসিটি, বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেট্রোরেলের কারণে আশপাশের এলাকায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ৯ বছরে উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ কিলোমিটারে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৩ থেকে ৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়েছে।

এটা স্পষ্ট যে জলবায়ু পরিবর্তন পরিবেশগত সংকট তৈরির পাশাপাশি নগরের শ্রমজীবীদের দৈনন্দিন কাজ, আয়রোজগার ও স্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। শ্রমিকদের এই মরণফাঁদ থেকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে নগর কর্তৃপক্ষকে সক্রিয় হতে হবে। কেবল ‘হিট অ্যালার্ট’ জারি করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে অবিলম্বে শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে রিকশাচালক ও পথচারীদের জন্য পর্যাপ্ত ছায়া, বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি এবং টয়লেটের স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে। ঢাকাকে মানবিক নগরী গড়তে হলে শ্রমজীবী মানুষদের জন্য এই শহরকে তাপ-সহনশীল করতে হবে।