সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

ইউক্রেন যুদ্ধে বাংলাদেশিরা

প্রতারক চক্র ও পাচারকারীদের থামাতেই হবে

দেশে কথিত উন্নয়ন, কর্মসংস্থানের সংকট বা বেকারত্বের বেড়াজাল ও উন্নত জীবনের প্রলোভনে পড়ে অনেক মানুষ অবৈধভাবে বিদেশে গিয়ে প্রতারিত হন। অনেকে মানব পাচারের শিকারও হন। অবৈধ পথে ইউরোপ যেতে ভূমধ্যসাগরে ডুবে গিয়ে বাংলাদেশের মৃত্যু এখন আর নতুন কোনো ঘটনা নয়। এর মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে, রাশিয়ায় গিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে একের পর এক বাংলাদেশি মৃত্যুর ঘটনা। এটি কোনোভাবেই মানা যায় না। আরও হতাশাজনক বিষয় হচ্ছে, এ নিয়ে রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করার কথা, তা–ও অনুপস্থিত।

সাধারণ বেসামরিক চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি কর্মীদের রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখভাগে ঠেলে দেওয়ার যে চিত্র আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, তা কেবল উদ্বেগজনক নয়; বরং রোমহর্ষ। রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতারণায় পা দিয়ে গত কয়েক মাসে অন্তত ৪০ বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিজ দেশের মাটিতে কর্মসংস্থানের অভাবে বিদেশের মাটিতে ভাগ্য বদলাতে গিয়ে আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা আজ ভিনদেশি যুদ্ধের ‘কামান দাগানো খোরাক’ বা ‘মানবঢাল’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছেন, এটি রাষ্ট্রের জন্য চরম লজ্জাজনক।

এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুবিধাবঞ্চিত এলাকার মানুষদের বাবুর্চি বা পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজের লোভ দেখিয়ে রাশিয়ায় নেওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর রুশ ভাষায় লেখা সামরিক চুক্তিতে তাঁদের জোরপূর্বক সই করিয়ে নেওয়া হয়। এমনকি একজন রুশ কমান্ডার এক ভুক্তভোগীকে সরাসরি বলেছিলেন যে তাঁকে আসলে ‘বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে’। কোনো সার্বভৌম দেশের নাগরিককে অন্য দেশের সেনাবাহিনীতে এভাবে দাসের মতো কেনাবেচা করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের চরম লঙ্ঘন। ফিরে আসা কর্মীদের ভাষ্যমতে, তাঁদের দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মরদেহ সংগ্রহ এবং আহত ব্যক্তিদের সরিয়ে নেওয়ার মতো বিপজ্জনক কাজ করানো হয়েছে। যাঁরা অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, তাঁদের ওপর নেমে এসেছে অমানুষিক নির্যাতন।

এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি জাগে নজরদারি নিয়ে। ‘এসপি গ্লোবাল’-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে প্রকাশ্যে এমন পাচার কার্যক্রম চালিয়ে গেল? কেন আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা বা প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সময়মতো এই বিপদের আঁচ করতে পারল না? তদন্তে জানা গেছে, মস্কোতে বসবাসরত এক বাংলাদেশি এই পাচারকারী চক্রের মূল হোতা। রাশিয়ার সরকারের সঙ্গে এই চক্রের যোগসাজশ থাকার যে সন্দেহ তদন্তকারীরা করছেন, তা যদি সত্য হয়, তবে বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ভূরাজনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়।

আমরা মনে করি, কেবল তদন্ত কমিটি গঠন বা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করাই যথেষ্ট নয়। রাশিয়া সরকার ও তাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অনতিবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করতে হবে। রাশিয়ার রণক্ষেত্রে বর্তমানে কতজন বাংলাদেশি আটকা পড়ে আছেন, তার সঠিক পরিসংখ্যান বের করা এবং তাঁদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা এখন সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। পাশাপাশি যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি এই মরণফাঁদ পেতেছে, তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

দেশের মানুষকে জীবিকার তাগিদে ভিটেমাটি বিক্রি করে বিদেশের মাটিতে অপঘাতে মরতে দেওয়া যায় না। ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে আর একটি প্রাণও যেন ঝরে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও সরকারকে তার পূর্ণ শক্তি ও কূটনৈতিক দক্ষতা নিয়ে এখনই মাঠে নামতে হবে।