সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

হারিয়ে যাওয়া চকরিয়া সুন্দরবন

বন পুনর্জন্মের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি

বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া উন্নয়ন নীতি আর মানুষের সীমাহীন মুনাফার লোভ যে কতটা আত্মবিধ্বংসী ও ধ্বংসাত্মক হতে পারে, কক্সবাজারের চকরিয়ার হারিয়ে যাওয়া সুন্দরবন তার বড় দৃষ্টান্ত। প্রায় ২১ হাজার একরের বনভূমিতে এখন মাত্র একটি সুন্দরীগাছ অবশিষ্ট আছে। অথচ এই ম্যানগ্রোভ বন একসময় উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দাদের ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষার জন্য প্রাকৃতিক বর্ম হিসেবে কাজ করত। বন থেকে মধু, মাছ, কাঠসহ বনজ সম্পদ আহরণ করে স্থানীয় লোকদের জীবিকা নির্বাহ হতো। স্বল্পমেয়াদি লাভের আশায় বন উজাড় করে দীর্ঘ মেয়াদে পরিবেশ ও অর্থনীতির ক্ষতি করা হয়েছে। তবে আশার কথা হলো, বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা আর দীর্ঘ মেয়াদে উদ্যোগ নেওয়া হলে দেশের এই প্রাচীন বনটিকে পুনর্জন্ম দেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন গবেষক ও পরিবেশকর্মীরা।

গত ২৮ মার্চ চকরিয়া উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে প্রথম আলোর আয়োজনে ‘হারিয়ে যাওয়া চকরিয়া সুন্দরবন ফিরে পাওয়ার পথ কী’ শীর্ষক গোলটেবিলে আলোচকেরা কীভাবে বনটির পুনর্জন্ম দেওয়া যায়, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশ দিয়েছেন। এর মধ্যে দখল ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা, মাটির পুনরুদ্ধার ও ‘সয়েল প্যান’ ভাঙা, বনের প্রাকৃতিক পুনর্জন্মকে অগ্রাধিকার দেওয়া, স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করে বিকল্প জীবিকা নিশ্চিত করা এবং সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার সুপারিশ করা রয়েছে। এর সব কটিই চকরিয়া সুন্দরবনের পুনর্জন্ম ঘটানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলেই আমরা মনে করি। তবে সবার আগে দরকার ম্যানগ্রোভ বনটিকে পুনরুদ্ধারের নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং তা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

গত শতকের সত্তর ও আশির দশকে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইউএনডিপির পরামর্শ ও অর্থায়নে চকরিয়া সুন্দরবনে চিংড়ি চাষ শুরু হয়েছিল। সরকার বনকে রপ্তানিমুখী চিংড়ি চাষের জন্য ইজারা দিতে শুরু করে। দাতা সংস্থাগুলোর দাবি ছিল, এতে অর্থনীতিতে গতি আনবে। বাস্তবে এটা যে কত বড় পরিবেশগত বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, একমাত্র টিকে থাকা সুন্দরীগাছ তার সাক্ষ্য দিচ্ছে। শুরুতে চিংড়ি চাষ লাভজনক হওয়ায় ইজারা পাওয়া ব্যক্তিরা দেদার বন উজাড় করেন। পরবর্তী সময়ে কৃত্রিম খাবার দিয়েও চিংড়ি চাষ লাভজনক করতে না পারায় জমিগুলোকে লবণের মাঠে রূপান্তর করা হয়। প্রাকৃতিক এই রক্ষাকবচ বিরান করে ফেলায় ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে চকরিয়া জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।

এটা সত্যি যে প্রায় পাঁচ দশক ধরে বন উজাড় করে যে বিশাল ক্ষতি করা হয়েছে, শিগগিরই তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। তবে প্রথম আলোর গোলটেবিল বৈঠকে পরিবেশকর্মী, বন–গবেষক থেকে শুরু করে শিক্ষক, সাংবাদিক, স্থানীয় বাসিন্দারা যেভাবে চকরিয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে তাঁদের উৎসাহ ও উদ্দীপনা দেখিয়েছেন, সেটা আশাবাদ তৈরি করে। আমরা মনে করি, সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলে চকরিয়া সুন্দরবনকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিএনপি সরকার ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা নিয়েছে। দেশের প্রতিটি অঞ্চলের স্বতন্ত্র ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, পরিবেশগত প্রয়োজনীয়তা ও আর্থসামাজিক পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় নিয়েই এই প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, যেমন আগাম বন্যা, অতিবৃষ্টি, তাপপ্রবাহ, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষার জন্য বনায়নের বিকল্প নেই। সে ক্ষেত্রে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রকৃতি–পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চকরিয়ার হারিয়ে যাওয়া ম্যানগ্রোভ বনটি পুনর্জন্মের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

একটি হারিয়ে যাওয়া বনও যে ফিরিয়ে আনা যায়, বিশ্বের কাছে সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করার বিরল সুযোগ কোনোভাবেই হাতছাড়া করা যাবে না।