সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

মূল্যস্ফীতি ও মজুরি

চাই বাজার নিয়ন্ত্রণ ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়

দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম উচ্চ মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুনে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ হলেও তা স্বস্তিদায়ক কোনো বার্তা দিচ্ছে না। কারণ, তিন মাস ধরেই এই হার ৯ শতাংশের ওপর রয়েছে। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু করে সাড়ে চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতির হারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের মানুষের মজুরি বাড়েনি। প্রতি মাসেই মূল্যস্ফীতির হার ছাপিয়ে গেছে মজুরি বৃদ্ধির হারকে। ফলে টানা ৫৩ মাস ধরে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় বা ক্রয়ক্ষমতা কমছে। দেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনানুষ্ঠানিক খাতে হওয়ায় এই বিশাল সময় ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি শ্রমিকশ্রেণি, দিনমজুর ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবনযাত্রাকে চরম অসহনীয় করে তুলেছে।

দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবনযাপনের মানে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ সংসারের খরচে কাটছাঁট করতে গিয়ে পুষ্টিকর খাবার, বিনোদন, পর্যটন ও সন্তানদের সুশিক্ষার মতো জরুরি খাতগুলোতে ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছে, যা সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যেও একধরনের স্থবিরতা তৈরি করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি হলো একধরনের অদৃশ্য কর, যা কোনো ঘোষণা ছাড়াই মানুষের পকেট থেকে টাকা কেড়ে নেয়। এর বিপরীতে আয় না বাড়ায় সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত ধারদেনা করে কিংবা সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাতে হচ্ছে। বিগত সময়ে এই সংকটকে দীর্ঘদিন পাশ কাটিয়ে যাওয়া এবং জোরালো পদক্ষেপ না নেওয়ার যে খেসারত দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি দিচ্ছে, তা থেকে উত্তরণের পথ এখনো দৃশ্যমান নয়। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও শুল্ক কমানোর মতো কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাজার এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

এই পটভূমিতে চলতি জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হতে যাচ্ছে। প্রায় ১৫ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর আয় বাড়ার এই সিদ্ধান্ত অবশ্যই ইতিবাচক। তবে এর একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক ও বাস্তব বাজারঝুঁকি রয়েছে। অভিজ্ঞতা বলে, সরকারি খাতে বেতন বাড়ার অজুহাতে অসাধু ব্যবসায়ী চক্র বাজারে নিত্যপণ্যের দাম, বাসাভাড়া ও পরিবহন খরচ আরেক দফা বাড়িয়ে দেয়। এ কারণে বাজারে নতুন করে অর্থপ্রবাহ বাড়লে তা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে
দিতে পারে। আর এমনটি হলে সরকারি চাকরিজীবী নন, এমন দেশের সিংহভাগ সাধারণ ও বেসরকারি খাতের মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো চরম বিপাকে পড়বে।

এই বহুমুখী সংকট মোকাবিলায় সরকারের নীতিগত অবস্থান আরও সুনির্দিষ্ট ও জোরালো হওয়া দরকার। প্রথমত, সরকারি খাতের বেতন বৃদ্ধির ধাক্কা যেন বাজারব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করতে না পারে, সে জন্য বাজার তদারকি ও সিন্ডিকেট ভাঙার কাজে কঠোরতা বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, বেসরকারি খাতের শ্রমিক ও সাধারণ কর্মচারীদের প্রকৃত আয় ধরে রাখতে বেসরকারি খাতেও মজুরি বা বেতন বাড়ানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ সৃষ্টি করা জরুরি। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পরিধি বাড়িয়ে প্রকৃত অভাবী মানুষের কাছে খাদ্যসহায়তা ও ন্যায্যমূল্যের কার্ড পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। সাড়ে চার বছরের এই দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির চক্র থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে না পারলে জনজীবনে স্বস্তি ফেরানো সম্ভব হবে না।