সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছেই

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমরা কেন ব্যর্থ হচ্ছি

সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি যে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে, তার আগাম সতর্কতা উচ্চারণ করেছিলেন কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্যবিদেরা। সেই সতর্কতা যে আমলে নেওয়া হয়নি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যই সেটা স্পষ্ট করছে। এ বছর ২ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ২৫০ জন মারা গেছেন। ২০০০ সালে দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব শুরুর পর এটি এক বছরে চতুর্থ সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড। আমরা মনে করি, সারা বছর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সরকারের যে শিথিলতা, তার মূল্য নাগরিকদের দিতে হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুতে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আগস্টে মৃত্যু হয়েছিল ৪৩ জনের এবং আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২০ হাজার ৫৩৬ জন। অক্টোবর মাসের প্রথম তিন দিনেও সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। এ বছর ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ অনেক বেড়ে গেছে।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি করাতে স্বজনদের এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে ডেঙ্গুর চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে পরিবারগুলোতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে।

এল-নিনোর প্রভাবে এবারের বর্ষা মৌসুম অপেক্ষাকৃত উষ্ণ; একই সঙ্গে থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে। এ রকম আবহাওয়া এডিস মশার প্রজনন ও বংশবিস্তারের জন্য আদর্শ। এর বিপরীতে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সমন্বিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক না হওয়ায় ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ ঠেকানো সম্ভব হয়নি।

ডেঙ্গু একসময় ঢাকা মহানগর ও বর্ষা মৌসুমের অসুখ হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর সংক্রমণ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বছরজুড়েই এই রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। দেখা যাচ্ছে যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মশা নিয়ন্ত্রণে গত ১১ বছরে ৮২৫ কোটি টাকা খরচ করেছে।  নিয়মিত কীটতাত্ত্বিক জরিপের মাধ্যমে এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করে সেগুলো ধ্বংসের বদলে বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্নভাবে ফগিং ও লার্ভিসাইডিং কার্যক্রম পরিচালনা করায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এটি তেমন কোনো কাজে আসেনি। উপরন্তু ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বড় শহরগুলোর বাইরে মশা নিয়ন্ত্রণের কোনো কার্যক্রম নেই বললেই চলে। ফলে ঢাকার বাইরেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। আমরা যদি মশা নিয়ন্ত্রণকে বিজ্ঞানভিত্তিক ও বছরব্যাপী কার্যক্রমে পরিণত না করি, তাহলে আরও হাজার কোটি টাকা খরচ করেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না।

একদিকে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে শিথিলতা, অন্যদিকে উপজেলা–জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির ঘাটতিও রয়েছে। ফলে ঢাকার হাসপাতালগুলোকে ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা নিতে কেন ঢাকায় আসতে হবে?

ডেঙ্গু নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতার অভাবও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। সরকারকে অবশ্যই ডেঙ্গুর প্রাথমিক উপসর্গ কী এবং কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে, এ বিষয়ে জনগণকে পরিষ্কার ধারণা দিতে হবে। বাড়িতে কীভাবে রোগীর যত্ন নেওয়া যায় এবং কোন কোন সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে, এ বিষয়ে বেশি করে তথ্য প্রচার করা গেলে সংকটাপন্ন রোগীর সংখ্যা কমে আসতে পারে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মৌসুমি তৎপরতা নয়, প্রয়োজন বছরব্যাপী সমন্বিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক কার্যক্রম। মশা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জেলা-উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমরা কেন ব্যর্থ হচ্ছি, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা সবচেয়ে জরুরি। নাগরিকের জীবন রক্ষায় সরকারকে এখনই কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।