সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

অবৈধ অস্ত্র উদ্বেগ বাড়াচ্ছে

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে

জাতীয় নির্বাচনের আগে ঢাকা ও শরীয়তপুরে অস্ত্র উদ্ধার এবং মুন্সিগঞ্জে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ২ ফেব্রুয়ারির এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরের ৩৬ দিনে দেশে অন্তত ১৫ নেতা–কর্মী রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এ পটভূমিতে ভোটের আগে সীমান্তের ৩০ পথে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশের খবর যারপরনাই উদ্বেগজনক। আমরা মনে করি, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশন, অন্তর্বর্তী সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সঙ্গে জড়িত বাহিনীগুলোর আরও বেশি তৎপর হওয়া প্রয়োজন।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা অনেক আগে থেকেই সরকারকে সতর্ক করে আসছিলেন যে চব্বিশের অভ্যুত্থানের আগে-পরে লুট হওয়া অস্ত্র এবং বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান হয়ে আসা অস্ত্র জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিবেশের ওপর হুমকি তৈরি করতে পারে। অভ্যুত্থানের সময় থানাসহ পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা ও কারাগার থেকে লুট হওয়া ৫ হাজার ৮০০ আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ১ হাজার ৩০০টির বেশি অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি। এ ছাড়া নির্বাচন সামনে রেখে সহিংসতার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে দেশে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ করেছে। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ঢাকায় বিদেশি অস্ত্রসহ আটক হওয়া অপরাধীদের বরাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, কমিশনের বিনিময়ে সীমান্তের ওপার থেকে অস্ত্র এনে এপারের কারবারিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সেসব অস্ত্র অসাধু রাজনৈতিক নেতা, সন্ত্রাসী, উগ্রপন্থীসহ অপরাধীদের কাছে পৌঁছে যায়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়েছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত ও বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের অন্তত ৩০টি পথ দিয়ে অবৈধ অস্ত্র দেশে প্রবেশ করে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে ৪ হাজার ৪২৭ কিলোমিটার সীমান্ত, এর মধ্যে ভারতের অংশে ৩ হাজার কিলোমিটারের মতো কাঁটাতারের বেড়া রয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঝিনাইদহ, রাজশাহী, কুমিল্লা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জেলায় চোরাচালান হয়ে আসা পণ্যের সঙ্গে অস্ত্রও প্রবেশ করে। সীমান্ত এলাকায় মাঝেমধ্যে অস্ত্রের কিছু চালান ধরা পড়লেও বেশির ভাগই নিরাপদে দেশের অপরাধীদের হাতে পৌঁছে যায়। গত শুক্রবার রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় একটি বাড়ি থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের সহযোগী মেহেদি হাসানকে ১১টি অত্যাধুনিক অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের ঘটনা তারই প্রমাণ দিচ্ছে।

সন্ত্রাসী ও পেশাদার অপরাধীদের হাতে অস্ত্র থাকলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার ঘটনা তার উদাহরণ। তফসিল ঘোষণার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ অভিযান শুরু করলেও এ অভিযানে চিহ্নিত, পেশাদার ও বড় সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারের সংখ্যা খুবই কম। এ সময়ে অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে মাত্র ২৩৬টি।

পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্রের সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে আসা অস্ত্র সার্বিকভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। জাতীয় নির্বাচনের আগের কয় দিন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর সময়। এ বাস্তবতায় সন্ত্রাসী, অসৎ রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে কোনো পক্ষই যাতে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর সুযোগ না পায়, সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক হতে হবে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়ে সীমান্ত সুরক্ষিত রাখতে হবে।

অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন যাতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।