সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম

হেক্সিংকে কালোতালিকাভুক্ত করা হয়নি কেন

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও বিনিয়োগে বর্তমান যে স্থবিরতা চলছে, নিশ্চিত করেই তার বড় দায় রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের। এ খাতে দেশি-বিদেশি গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে সামষ্টিক স্বার্থকে চরমভাবে উপেক্ষা করা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে, গত সরকারের আমলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের (বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা) অনিয়ম হয়েছে। ফলে এই খাতের সংস্কার এবং অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বিচার ও জবাবদিহির আওতায় আনার জোরালো দাবি সামনে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে সেটা না হওয়ায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত ঘিরে নতুন করে সিন্ডিকেট তৎপর হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতে মিটার–বাণিজ্য ও অর্থ পাচারে অভিযুক্ত বিতর্কিত চীনা কোম্পানি হেক্সিং বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ওজোপাডিকোর মিটার কেনা–সংক্রান্ত দুটি দরপত্রে অংশগ্রহণ করেছে। দুই দরপত্রেরই কারিগরি মূল্যায়ন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এ খবরে আমরা উদ্বিগ্ন না হয়ে পারি না।

অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে হেক্সিংয়ের বিরুদ্ধে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা বা কোম্পানিগুলোকে দরপত্র দলিল প্রস্তুতিতে হস্তক্ষেপ, মূল্যায়নপ্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানোসহ আর্থিক কেলেঙ্কারির বিষয়টি। বিদ্যুৎ বিভাগ যেখানে দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাকে চিঠি দিয়ে চীনা এই কোম্পানির ব্যাপারে সতর্ক করেছে, সেখানে কীভাবে কোম্পানিটি দরপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ পাবে?

ওজোপাডিকোর ভাষ্য হচ্ছে, বিদ্যুৎ বিভাগ সতর্ক করলেও যেহেতু হেক্সিংকে কালোতালিকাভুক্ত করা হয়নি, সে কারণে দরপত্রে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোম্পানিটির সরাসরি বাধা নেই। এই যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য? যেখানে সরকারের তদন্ত প্রতিবেদনে কোম্পানিটির সঙ্গে লেনদেনের ব্যাপারে সতর্ক করেছে, সেখানে বিতরণ কোম্পানি কীভাবে ভিন্ন যুক্তি দেখাতে পারে? এ খাতে দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে শুধু রাজনীতি ও দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট নয়, বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরাও জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন ছিল।

আমরা মনে করি, জ্বালানিবিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলম যথার্থই বলেছেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত আইনি প্রক্রিয়ায় হেক্সিং অব্যাহতি না পায়, ততক্ষণ তারা অপরাধী। তাদের ব্যবসা করার সুযোগ রাখা জনস্বার্থবিরোধী।’ গত সরকারের আমলে সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের স্বজনদের সঙ্গে মিলে হেক্সিং মিটার–বাণিজ্যের চক্র গড়ে তুলেছিল। সরকারের সঙ্গে যৌথ কোম্পানি করে দরপত্র ছাড়াই শত শত কোটি টাকার মিটার–বাণিজ্য করেছিল। শুধু বাংলাদেশ নয়, দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে ভারত, নেপাল, কেনিয়াসহ অনেক দেশে কালোতালিকাভুক্ত হয়েছে কোম্পানিটি।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত কৌশলগত একটি খাত। এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা ও মানুষের জীবনযাপনের ব্যয় সরাসরি যুক্ত। এখানে দুর্নীতি ও অনিয়মের সুযোগ থাকলে তার বিশাল বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই বহন করতে হয়। আমরা মনে করি, সরকারের দায়িত্ব শুধু সতর্ক করা নয়। জনস্বার্থে সরকারকে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অনিয়ম, দুর্নীতি ও চক্র–বাণিজ্যে জড়িত কোম্পানি হেক্সিংকে অবশ্যই আইনি প্রক্রিয়ায় কালোতালিকাভুক্ত করতে হবে। আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হেক্সিংকে সব ধরনের দরপত্র থেকে দূরে রাখাও সরকারের দায়িত্ব।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত ঘিরে যেন নতুন করে সিন্ডিকেট, চক্র ও গোষ্ঠীতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের।