সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস

সুষ্ঠু তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নিন

দূরদূরান্ত থেকে ঢাকায় এসে পরীক্ষার হলে বসে চাকরিপ্রার্থীরা যখন জানতে পারেন প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার কারণে পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে, এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় আর কী হতে পারে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের শনিবারের নিয়োগ পরীক্ষার ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটেছে। আমরা মনে করি, এটি সরকারি নিয়োগপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নির্ভরযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম বড় সংকট। বেসরকারি খাত অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হলেও দীর্ঘদিন ধরেই বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে পড়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সেভাবে বাড়ছে না। দেশের শ্রমবাজারের কথা চিন্তা না করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিস্তার হওয়ায় শিক্ষিতদের জন্য শোভন চাকরি যেন সোনার হরিণ হয়ে উঠেছে।  আইএমএফের ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ম্যাগাজিনের সেপ্টেম্বর সংস্করণে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন শিক্ষিত তরুণের মধ্যে ৩৬ জন বেকার। এ বাস্তবতায় সরকারি চাকরির জন্য তরুণদের স্বপ্ন দেখাটাই স্বাভাবিক। সরকারকে মনে রাখা প্রয়োজন যে চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো অপরাধ হলে তরুণদের স্বপ্নে বড় ধাক্কা লাগে।

বাংলাদেশে নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, অনিয়ম, দুর্নীতির ঘটনা নতুন নয়। ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের সূচনাই হয়েছিল সরকারি চাকরিতে অনিয়ম ও বৈষম্যের প্রতিবাদে। ছাত্র–তরুণ–জনতার এত বড় আত্মত্যাগের পরও প্রশ্নপত্র ফাঁসের পুরোনো চর্চা ফিরে আসার ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযোগ তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। আমরা মনে করি, এ ঘটনায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। ফলে তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে দায়িত্বে অবহেলা বা গাফিলতি থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির মুখোমুখি করতে হবে। তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করাও জরুরি।

যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার ২৪২টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন প্রায় ৩ লাখ ১৯ হাজার প্রার্থী। এর অর্থ, একটা চাকরির জন্য প্রায় ১ হাজার ৩১৮ জন প্রার্থীকে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। দেশের সব প্রান্ত থেকেই প্রার্থীরা ঢাকায় আসেন। পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় যাতায়াত ও থাকার খরচের পাশাপাশি তাঁদের চাকরির প্রস্তুতিও হোঁচট খেল। এ ঘটনায় খুব স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুব্ধ চাকরিপ্রার্থীরা সড়কে নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। 

সব চাকরির পরীক্ষা কেন ঢাকাতেই হতে হবে, সেটা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। তিন লাখের বেশি মানুষের ঢাকায় এসে পরীক্ষা দেওয়ার অর্থ, রাজধানীর ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হওয়া। বিভাগীয় পর্যায়ে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করলে শুধু ঢাকার ওপরই চাপ কমবে তা নয়, চাকরিপ্রার্থীদেরও সময় ও ব্যয়ের বোঝা কমবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা যেখানে বিভাগীয় শহরে নেওয়া হয়, সেখানে চাকরির পরীক্ষার ক্ষেত্রেও একই পথ অনুসরণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

একটি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা হাজারো তরুণের কাছে পুরো নিয়োগব্যবস্থাকেই অবিশ্বাস্য করে তুলতে পারে। আমরা মনে করি, স্থগিত পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে নেওয়ার পাশাপাশি প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সুযোগ কোথায় তৈরি হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এবারের ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। সরকারি নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।