চট্টগ্রামের লালখানবাজার শহীদ নগর সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটারদের সারি। ১২ ফেব্রুয়ারি
চট্টগ্রামের লালখানবাজার শহীদ নগর সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটারদের সারি। ১২ ফেব্রুয়ারি

মতামত

ভোটের পরের দায়: নাগরিক প্রত্যাশার মানচিত্র

চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) আসন বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে বরাবরই একটি কৌতূহলের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আসনকে অনেকেই রাজনৈতিক ‘ব্যারোমিটার’ বলেন।

১৯৯১ সালে বিএনপির আবদুল্লাহ আল নোমান এখানে জয়ী হয়েছিলেন, সেই নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের এম এ মান্নান জয়ী হন এবং একই বছরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। ২০০১ সালে আবার নোমান জয়ী হন, বিএনপি সরকার গঠন করে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের আফসারুল আমিন বিজয়ী হন এবং আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। এই ধারাবাহিকতা চট্টগ্রাম-৯-কে শুধু একটি সংসদীয় আসন নয়; বরং জাতীয় রাজনৈতিক প্রবণতা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে পরিণত করেছে।

কোতোয়ালি ও বাকলিয়া নিয়ে গঠিত এই আসন মূলত পুরোনো চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্র। ব্যবসা, শিক্ষা, প্রশাসন, ছোট-বড় বাজার, ঘনবসতি—সব মিলিয়ে এটি এক বহুমাত্রিক নগর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। ফলে এখানে ভোট শুধু দলীয় প্রতীকের ওপর নির্ভর করে না, নাগরিক জীবনের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা, আশা-হতাশা এবং বাস্তব সমস্যাও বড় ভূমিকা রাখে। যে কারণেই হোক, এই আসনের ফলাফল জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে বারবার মিল খুঁজে পাওয়া গেছে।

এবারেও তার ব্যতিক্রম হলো না। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনে এই আসন থেকে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী আবু সুফিয়ান। আর বিএনপি যে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে, সেটা এখন সুস্পষ্ট। চট্টগ্রামের আসনে দুটি আসন ছাড়া সব কটি আসনে বিএনপি প্রার্থী জিতেছে। যদিও আদালতের নির্দেশে ফটিকছড়ির সারোয়ার আলমগীর ও সীতাকুণ্ডের আসলাম চৌধুরীর বিজয়ের ঘোষণা স্থগিত রয়েছে। তথাপি ধরে নেওয়া যায়, বিএনপিই শেষ পর্যন্ত ওই দুটি আসনে বিজয়ী হবে।

ঐতিহাসিক একটি নির্বাচন বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতায় ২০ বছর পর বিএনপি আবার ক্ষমতায় আসছে। একটা ব্যাপার ভীষণভাবে লক্ষণীয় ছিল, বৃহস্পতিবার রাত যতই গভীর হচ্ছিল, ততই ক্রমশ পরিষ্কার হয়ে আসছিল কারা জিততে যাচ্ছে। কিন্তু কোথাও কোনো রকম হইহুল্লোড় কিংবা বিজয়োল্লাস করতে দেখা যায়নি। বিশেষ করে চট্টগ্রামে দেখা কিংবা শুনিনি বিজয়ের উল্লাসে কেউ উন্মত্ত হয়ে যেতে, কিংবা প্রতিপক্ষকে হেনস্তা করতে।

বিজয়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় কোনো উল্লম্ফন না করে প্রাথমিক দায়িত্বটা পালনে চট্টগ্রামে বিএনপি সক্ষম হয়েছে। এতে অনেকেই সন্তুষ্ট, তবে তার চেয়েও বড় কথা, এখানকার মানুষ তাঁদের প্রতিনিধি থেকে দৃশ্যমান কাজ দেখতে চান। মানুষের সেই আকাঙ্ক্ষার কথা মনে রেখেই নির্বাচনী প্রচারণায় চট্টগ্রামের প্রার্থীরা মৌলিক সমস্যাগুলোর কথা সামনে এনেছিলেন।

প্রাথমিক বিজয়ের খবরের প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিএনপির বিজয়ী প্রার্থী তার পুরোনো প্রতিশ্রুতির কথা পুনরাবৃত্তি করলেন। গণমাধ্যমে প্রচারিত সাঈদ আল নোমান তাঁর বক্তব্যে জলাবদ্ধতা, যানজট, নগর অবকাঠামোর দুর্বলতা এবং নাগরিক সেবার ঘাটতির বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে পুরোনো শহরের সংকীর্ণ সড়ক, নিষ্কাশনের ব্যবস্থার অকার্যকারিতা এবং পরিকল্পনাহীন উন্নয়নের কারণে সৃষ্ট ভোগান্তির কথা উল্লেখ করেছেন। একজন প্রার্থী যখন নির্বাচনের জেতার খবর শোনার পরপর সরাসরি সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেন এবং সমাধানের রূপরেখা নিয়ে কথা বলেন, তা অবশ্যই তাঁর ভোটারদের মনে আশার সঞ্চার করে। নাগরিকেরা এমনই চান। স্পষ্ট স্বীকারোক্তি ও অঙ্গীকারগুলোকে যেন তিনি সব সময় গুরুত্ব দেন। সব সময় মনে রাখেন।

কোনো সমস্যার কথা স্বীকার করা মানে সমাধানের প্রথম ধাপ। ক্ষমতায় গিয়ে তাঁরা দ্বিতীয় ধাপটি শুরু করবেন—এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কারণ আমরা জানি, নির্বাচন শেষ হলেই দায়িত্ব শুরু হয়। একজন জনপ্রতিনিধির কাছে চট্টগ্রামের নাগরিকদের প্রথম প্রত্যাশা—জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। বর্ষা এলেই চট্টগ্রামের বিস্তর এলাকা বহু এলাকা পানিতে ডুবে যায়, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবন থমকে দাঁড়ায়। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সমন্বিত ড্রেনেজব্যবস্থা, খাল পুনরুদ্ধার এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা জরুরি। একই সঙ্গে যানজট নিরসন, ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং গণপরিবহন–ব্যবস্থার শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা—এসবও এখন সময়ের দাবি। বহুল উপেক্ষিত, বহুল প্রতীক্ষিত কর্ণফুলী নদীর ওপর একটি নতুন কালুরঘাট সেতু নির্মাণের বিষয়টিকে সবার আগে গুরুত্ব দেওয়ার দরকার।

নিরাপত্তা ও নাগরিক শৃঙ্খলাও বড় প্রত্যাশার জায়গা। ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক নিরাপত্তা, মাদক ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ—এসব বিষয়ে দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকলে উন্নয়নের অন্য সব কথাই ম্লান হয়ে যায়। একইভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের সহায়তা, পুরোনো বাজারগুলোর আধুনিকায়ন এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির ব্যাপারটিকেও অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জবাবদিহি। নাগরিকেরা এখন শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চান না, তাঁরা জানতে চান কোন প্রকল্প কখন শুরু হবে, কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, কত দূর অগ্রগতি হয়েছে। নিয়মিত গণশুনানি, উন্মুক্ত আলোচনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য প্রকাশ—এসবের মাধ্যমে একজন জনপ্রতিনিধি নাগরিক আস্থা অর্জন করতে পারেন। গণতন্ত্রের শক্তি কেবল ভোটে নয়, নির্বাচনের পর ধারাবাহিক যোগাযোগে।

চট্টগ্রাম-৯-এর ইতিহাস দেখায়, এই আসন জাতীয় রাজনীতির গতিপথের সঙ্গে বহুবার সামঞ্জস্যপূর্ণ থেকেছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় সত্য হলো—এই এলাকার মানুষ উন্নয়নের স্পষ্ট ছাপ দেখতে চান। দল, প্রতীক বা রাজনৈতিক হিসাবের ঊর্ধ্বে উঠে একজন প্রতিনিধি যদি নাগরিক জীবনের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে আন্তরিক ও ধারাবাহিক উদ্যোগ নেন, তবেই এই আসনের ঐতিহ্য নতুন অর্থ পাবে।

নির্বাচন একটি সূচনা, সমাপ্তি নয়। ভোটের মাধ্যমে যে আস্থা দেওয়া হয়, তা রক্ষা করার দায়িত্ব জনপ্রতিনিধির, আর সেই আস্থার কেন্দ্রে থাকে নাগরিকের প্রতিদিনের জীবন, তার পথঘাট, তার ব্যবসা, তার নিরাপত্তা, তার স্বপ্ন। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই একজন প্রতিনিধি ইতিহাসে স্থান করে নেন।

  • ওমর কায়সার প্রথম আলোর চট্টগ্রাম অফিসের বার্তা সম্পাদক

    *মতামত লেখকের নিজস্ব